• সন্ধ্যা ৬:৩৮ মিনিট বৃহস্পতিবার
  • ১৯শে চৈত্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
  • ঋতু : বসন্তকাল
  • ২রা এপ্রিল, ২০২০ ইং
এই মাত্র পাওয়া খবর :
সোনারগাঁয়ে ইউপি সদস্যের উপর হামলার প্রতিবাদে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ রাতের আধারে পৌরসভার ভট্টপুরে এমপি ও নির্বাহী কর্মকর্তার ত্রাণ বিতরণ ♦১ এপ্রিল: ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়♦ হারিয়ে যাওয়া এক ইতিহাস ‘মুড়ির টিন’ সোনারগাঁয়ে বিচার সালিশকে কেন্দ্র করে ইউপি সদস্যসহ ৬জনকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে আহত করোনাভাইরাস: বাংলাদেশে সাধারণ ছুটি আরও এক সপ্তাহ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত সামাজিক দূরত্ব না বলে আসুন বলি শারীরিক দূরত্ব: রবিউল হুসাইন মান্নানের উদ্যোগে ২ শতাধিক অসহায় পরিবারের মাঝে শ্রমিক দলের ত্রাণ বিতরন সাদিপুর ইউনিয়নে দুস্থ-অসহায় পরিবারে মাঝে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ সোনারগাঁয়ে কর্মহীন হত দারিদ্রের মাঝে যুবলীগের সাধারণ সম্পাদকের খাদ্য সামগ্রী বিতরণ রাতের আধারে এমপি লিয়াকত হোসেন খোকার খাদ্য সামগ্রী বিতরণ অব্যাহত সামাজিক উদ্যোগে অসহায়দের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করোনা আক্রান্ত ব্যক্তির দাফন ও সৎকারের দায়িত্ব নিতে চান কাউন্সিলর খোরশেদ সোনারগাঁয়ে মঙ্গলেরগাঁও আদর্শ জনসেবা সংগঠনের উদ্যোগে ত্রান বিতরন বুলবুল আহম্মেদের উদ্যোগে চিলারবাগ গ্রামে খাদ্য সামগ্রী বিতরন সোনারগাঁয়ে অসহায় পরিবারে মাঝে স্বেচ্ছাসেবক দলের ত্রাণ বিতরণ আড়াইহাজারে প্রতিপক্ষের হামলায় নারী টেটাবিদ্ধসহ আহত ১০ পিরোজপুর ইউপি’র গ্রাম পুলিশদের সুরক্ষায় দায়িত্ব নিলেন চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মাসুম সোনারগাঁয়ে সহস্রাধিক অসহায় পরিবারের পাশে দাঁড়ালেন রূপায়ন
নষ্ট প্রেম নষ্ট প্রেম

নষ্ট প্রেম নষ্ট প্রেম

রুমাশ্রী সাহা চৌধুরী

আমি বিপাশা,এখন মানে প্রায় পঁচিশ বছর আগে বিপাশা দাস থেকে মজুমদার হয়েছি। চাকরি করি,একমাত্র ছেলে স্বামী আর শাশুড়িমাকে নিয়ে আমার সুখের সংসার শাশুড়িমা কিছুদিন যাবৎ অসুস্থ ছিলেন ওনাকে ঘিরে ছিলো অনেকটা ব‍্যস্ততা। সেইসময় আমার মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করে বলেছিলেন,” আসছে জন্মে যেন তোর মেয়ে হয়েই আসি। সত‍্যিই তুই আমার মা।”
আমার ছেলে সৌরভ আমার ভালো বন্ধু,এখন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে। আজকাল একটু কম সময় পায়। তবুও রাতে জমিয়ে একটা আড্ডা হয় আমাদের খাবার টেবিলে। আমার বর বিদ‍্যুতকে কি বলবো?..অভিভাবক,বন্ধু,আমার সবচেয়ে হিতাকাঙ্খী না ভগবান? ও না থাকলে বোধহয় আমার উচ্চশিক্ষা চাকরি কিছুই হতোনা।
সত‍্যিই আমি খুব খুব সুখী। খুব কথাটা দুবার বললাম,আসলে আমার মনে কি আছে তা বোধহয় আমি নিজেই খুঁজে বেড়াই আজও, কখনো ব‍্যস্ত সকালে কখনো বা ক্লান্ত বিকেলে। না না মনে কিছু নেই,কি আবার থাকবে? বিশ্বাস করুন আমি ওকেই খুব ভালোবাসি আর শ্রদ্ধা করি।
আমি গ্ৰামের মেয়ে,আমরা বেশ কয়েকজন ভাইবোন,তবুও পড়াশোনার জন‍্য বাবার কম ক্ষমতা থাকলেও কলকাতা শহরের বাংলা মিডিয়ামে ভর্তি করে দিয়েছিলেন আমাকে, হস্টেলেই থাকতাম। তবুও প্রেম হয়ে গিয়েছিলো কোন এক সরস্বতীপুজোর দিনে ওর সাথে। আমার হলুদ শাড়ি আর খোলাচুলে বন্দী হয়েছিলো রজতের মন। তাই কড়াকড়ির ঘেরাটোপ ছাড়িয়ে একটু দেখা,কখনো লুকিয়ে কথা বা লুকোনো চিঠিতে আমি রজতের প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম। আমার সবটুকুই তখন রজত আর আমি ওর মোমের পুতুল। ঐ নামেই আমাকে ডাকতো ও,স্কুলের গন্ডী পেরিয়ে কলেজ,অনেকটা স্বাধীনতা। প্রেম আরেকটু বেশি গাঢ় তখন। খুব বই পাগল ছিলো রজত আমিও ভীষণ ভালোবাসতাম বই পড়তে আর বইবন্দী প্রেমে ভাসলো আমার মন। ওর জন্মদিনে বই ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারতাম না। ” ভালোবাসায় থেকো এমনি একদম আমার হয়ে সবসময়…তোমার মোমের পুতুল।”
কত বইয়ে যে লিখে দিয়েছি এমন। ওর চোখদুটো খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠতো,বলতো,” কি সুন্দর!লিখে দাও বইগুলোতে,আমার সবচেয়ে প্রিয় উপহার। সবসময় আমার কাছে থাকবে।”
অভিমান করে আমি বলতাম,” আর আমি? আমি থাকবোনা,সবসময় তোমার কাছে?”
মজা করে বলতো,” আমার মোমের পুতুল বৌ আর বই দুটোকেই একদম বুকের কাছে ধরে রাখবো।”ওর উষ্ণ আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরতো আমাকে আরো নিবিড়ভাবে।
রজতের বাড়িতে সেভাবে কখনোই আমার যাওয়া হয়নি। শুনেছি ওর কষ্টের শেষ ছিলোনা,ওর মত দুর্ভাগ্য বোধহয় কম মানুষেরই হয় আর ওর দুঃখের কথা শুনে যেন আরও বেশি ওর কাছে চলে এসেছিলাম। সবসময় বলতো,” তুমি তো জানো আমার মা ছোটবেলায় মারা গেছে,আমার নতুন মা আমাকে চাকরের মত খাটিয়েছে আর অত‍্যাচার করেছে। কখনো একটুও ভালোবাসা পাইনি। শুধু তুমি আমাকে একটু ভালোবেসো তাহলেই হবে। আমি ভালোবাসার কাঙাল তাই তো ছুটে ছুটে তোমার কাছে আসি। আর যাই বাবার বন্ধু মনতোষ কাকুদের বাড়ি,ওরা আমাকে খুব ভালোবাসে।”
ওর কষ্টের কথা শুনে আমার মনটা কেমন যেন হয়ে যেতো,ইচ্ছে করতো নিজের একদম কাছে ওকে রেখে সব ভালোবাসা উজাড় করে দিই।” খুব খুব ভালোবাসতাম ওকে খুউব। কত কথাই না হত ওর সাথে..তার মাঝেই শুনেছি মনতোষ কাকু আর সুনীতার কথা। বলত,” কাকু,কাকিমা খুব ভালো আমাকে অনেক ভালোবাসা দিয়েছেন। সুনীতা আমার ছোটবেলার বন্ধু,তবে তোমার মত সুন্দরী নয়। ও জানে আমাদের সব কথা।”
আমি রাগ করে বলেছিলাম অমন বলতে নেই,ভগবান সবার মধ‍্যেই সৌন্দর্য দিয়েছেন নিজের মত করে। ” সত‍্যিই মোমের পুতুল তোমার অনেক বড় মন।সুনীতাটা খুব পাজি জানো,আসলে ছোটবেলা থেকে চিনি ওকে তাই মাঝে মাঝেই বলে ও বাড়িতে তোমাকে কে আর ভালোবাসে। তুমি এই বাড়িতেই থেকে যাও। বাবা মা তোমাকে যা ভালোবাসে তোমাকেই সব দিয়ে দেবে। আর এত সম্পত্তি নিয়ে আমিই বা কি করবো?
আমার হঠাৎই বলে ফেলেছিলাম,দেখো হয়ত সুনীতাকে সমেত সবটাই তোমাকে মনতোষকাকু দিয়ে দেবেন। তাহলে আর তোমার কোন অভাবও থাকবেনা,কষ্টও থাকবেনা।
খুব রেগে গিয়েছিলো রজত সেদিন,” আর কোনদিন যেন এমন কথা না শুনি মোমের পুতুল,আমার সবটা জুড়ে শুধু তুমি।”
আমি আবেগে,ভালোবাসায় মাথা রেখেছিলাম পরম নির্ভরতায় ওর কাঁধে। ও কাছে টেনে বলেছিলো,” আমাকে একটু সময় দাও।”
কলেজের পর চাকরির চেষ্টা করে বেশ কয়েকটা ভালো চাকরির অফার পেয়েছিলাম বাইরে,কিন্তু আমি তখন রজতের প্রেমে ভাসছি। ভেবেছি ওকে ছেড়ে দূরে চলে গেলে কি করে থাকবো আমি? ছেড়ে দিয়েছিলাম এয়ার ইন্ডিয়ার চাকরির অফারটাও। বাড়ি থেকে তখন বিয়ের চেষ্টা করছে,সত‍্যিই হয়ত সেটাই স্বাভাবিক। আমার এভাবে বাইরে থাকা চাকরির চেষ্টা আর পড়াশোনা করার জন‍্য আর কতদিন ওরা মানবে?তবুও নানা বাহানায় অনেকদিন ওদের ঠেকিয়ে রেখেছি।
বেশ কয়েকদিন রজত আসেনা,কোন খবরও নেই,ওদের ল‍্যান্ডফোন নম্বরটা ছিলো। সাহস করে ফোন করলাম,এর আগে দু একবার করেছি। দুদিন অপরিচিত গলা শুনে ছেড়ে দিয়েছিলাম,কয়েকদিন বাদে ধরলো ওর ভাই বললো,”দাদা মনতোষকাকুদের বাড়িতে, ওনার শরীর খারাপ তাই গেছে।”
মনটা একটু শান্ত হলো জেনে,তবুও খুবই দরকার তখন ওকে আমার,কবে যে আসবে?আসলে তখন হস্টেল ভাঙার কথা হচ্ছে যেখানে আমি থাকতাম।
বেশ কয়েকদিন পরে ও এসেছিলো দেখা করতে প্রথমে আমার হস্টেলে ওখানে বেশি কথা হলোনা। তারপরে একদিন এলো নন্দনে আমাদের পরিচিত আর মন দেওয়া নেওয়ার সেই প্রিয় জায়গাটাতে।
কিন্তু ও কেন আমাকে মোমের পুতুল ডাকছে না? আজ ওর চোখেমুখে কেন নেই সেই ভালোবাসার পরশমাখা চাউনি?শুকনো গলায় বলেছিলাম,বাড়ি থেকে খুব দেখাশোনা করছে বিয়ের জন‍্য আসলে মায়ের শরীর ভালো নেই। ছোটবোনের ও সম্বন্ধ আসছে। এদিকে শুনছি হস্টেল ভাঙবে,ওরা নোটিশ দিয়েছে তাড়াতাড়ি হস্টেল ছাড়ার জন‍্য। চাকরিটাও নিলামনা তোমাকে ছেড়ে থাকতে হবে বলে। এখন আমি কি করবো,কিছুই বুঝতে পারছিনা। বাড়িতে যেতে আমি চাইছিনা,ওখানে গেলেই বিয়ে করে নিতে হবে,আর কোন অজুহাত দেবো। আরও হয়ত কিছু বলতাম কিন্তু বলা হলোনা।
” দ‍্যাটস্ ইয়োর প্রবলেম,আমি তোমাকে একবারও বলিনি চাকরির অফার ছাড়তে। সত‍্যিই তো এত ভালো চাকরি পেয়ে ছাড়লে কেন? তোমরা মেয়েরা সত‍্যিই পারো,হ‍্যাঁ দেখা করেছি গল্প করেছি তুমি আমার বন্ধু ছিলে। এখনও আছো তাই বলে এভাবে নিজের জীবনে ইচ্ছেমত আমাকে জড়াতে চাইছো কেন?”
আমার গলাটা বুজে আসে,ওর গলাতে এতটা বেশি প্রত‍্যাখ‍্যান ছিলো যে আমি কেমন যেন বোবা হয়ে যাই..কিন্তু আমি যে তোমার মোমের পুতুল,তুমি তো আমাকে স্বপ্ন দেখিয়েছিলে,বেনারসী পরে কনে দেখা আলোয় বৌ সাজার স্বপ্ন। তুমি কি সব ভুলে গেলে?
” একটু বেশি নাটক করছো না কি? আমার গল্পকে যদি তুমি সত‍্যি ভাবো দ‍্যাটস ইয়োর প্রবলেম। আবার বলছি,আমার চাকরির ঠিক নেই থাকার জায়গা নেই,বাড়িতে সৎমা।আমি অযথা তোমাকে নিজের অনিশ্চিত ভবিষ‍্যতে জড়াবো কেন শুনি?আমার আর কিছু বলার নেই। তুমি এবার বাড়ি যাও।”
লজ্জায়,অপমানে,ঘেন্নায় মাটির সাথে মিশে যেতে ইচ্ছে করছিলো।টলতে,টলতে বাড়ি ফিরেছিলাম প্রায় অসুস্থ হয়ে। খাওয়া,ঘুম সবই উঠে গিয়েছিল কদিন। বাড়ি থেকে খুবই বিয়ের তোড়জোড় করছিলো,বেশ কয়েকটা সম্বন্ধ এসেছিলো। মেজো জামাইবাবু বারবার বলছিলো এক বন্ধুর কথা। ওদের কোন দাবি নেই,শুধু একটা ভালো শিক্ষিত মেয়ে চাই। রাজি হতে হয়েছিলো আমায় বাড়িতে বলেছিলাম কোন অনুষ্ঠান কোরনা,রেজেস্ট্রী করে হবে বলে দিয়ো। মাসখানেকের মধ‍্যেই হঠাৎই আমার বিয়ে হয়ে গিয়েছিলো।শুধুই একটা সই আর কিছুনা,সিঁদুরটাও আমি পরিনি। হয়ত তোমরা সবাই ছিঃ ছিঃ করবে আমাকে। বলবে একটা নষ্ট চরিত্রের মেয়ে আমি,বিয়ে করলাম অথচ সিঁদুর পরলাম না। আমার স্বামী, কিনেছিলো শাড়ি গয়না কিন্তু পুরোনো পোশাকেই আমার বিয়ে হয়েছিলো। সিঁদুর পরানোর কথা হতেই আমি মাথা নেড়ে মাথা নামিয়েছিলাম ও হেসে বলেছিলো,”থাক পরে হবে,আসল তো সই,সেটাই তো হয়ে গেছে আবার কি?”
কনে দেখা আলোয় প্রথম কনের সাজে আমাকে দেখতে চেয়েছিলো রজত। সেই প্রতিশ্রুতির রঙে আর অন‍্য কারো সিঁদুরে রাঙাতে পারলামনা নিজেকে। কেমন যেন অদ্ভুত লেগেছিলো আমার স্বামীর আচরণে,আমার সমস্তটা ও মেনে নিয়েছিলো কোথাও কোন স্বামীত্ব বা জোর খাটায়নি। ওর উদারতার কাছে নিজেকে ছোট মনে হয়েছিলো,মনে হচ্ছিলো ওকে ঠকাচ্ছি না তো? বিবেক বলেছিলো না ঠকাইনি,আমি ভালোবেসেছিলাম অন‍্য কাউকে পরিস্থিতি আমায় বাধ‍্য করেছে অন‍্য সংসার পাততে, আর তারমধ‍্যে দোষের কি? এত সহজে কি এত বছরের ভালোবাসা ভুলে যাওয়া যায়?সব কিছুর মধ‍্যেই যেন রজতকেই দেখতে পাই।জানি তোমরা বলবে তাহলে আমি বিয়ে করলাম কেন? হয়ত আর কোন উপায় ছিলোনা আমার সেই সময়। বিশ্বাস করো আমি ঠকাতে চাইনি আমার বরকে,চেষ্টা করেছি মন দিয়ে সংসার করতে ওকে সুখী করতে। কিন্তু কি করে ভুলবো বড্ড পাগল পাগল লাগতো।
ফুলশয‍্যার রাত্রিটা দুজনের গল্পেই কেটে গিয়েছিলো, ও বেশি কথা বলেছিলো আমি বলেছিলাম কম। শুনেছিলাম ওর বাবার দুই বিয়ে,ওর মা দ্বিতীয় পক্ষের বৌ।সবসময় অত‍্যাচারিত হয়েছেন নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে করতে হত সবটা। তাই ও কখনো মেয়েদের ওপরে জোর খাটাতে চায়না। বিশ্বাস করে মেয়েদের ভালো থাকার জন‍্য আর্থিক স্বাধীনতা খুবই জরুরী। “তুমি কি কোন কারণে কষ্ট পেয়েছো?আমার জীবনেও অনেক কষ্ট,অনেক না পাওয়া। যা হয়েছে ভুলে গিয়ে আবার সবটা শুরু করো নতুন করে। পড়াশোনা আরও করো,তোমাকে উচ্চশিক্ষা পেতে হবে।”
আমি বলতে পারিনি আমার কি কষ্ট,ভয় পেয়েছিলাম। হয়ত বা যা পেয়েছি সবটাই হারানোর ভয়ে।
দেখতে দেখতে প্রায় একমাস হয়ে আসছিলো বিয়ের। একদিন সাজলাম,খুব সাজলাম,সিল্কের শাড়ি পরলাম,গয়না পরলাম মাথায় আঁকলাম সিঁদুরের রেখা। ওর চোখে দেখলাম মুগ্ধতা। মনকে বোঝালাম আর কতদিন শোক পালন করবো?এবার সব কালো ধুয়ে মুছে যাক সিঁদুরের রাঙা আভায়।
” খুব সুন্দর লাগছে আজ তোমায়। চলো কোথাও থেকে ঘুরে আসি। তেমনিভাবে কোথাও বেরোনো হয়নি আমাদের। কোথায় যাবে চলো?”
তাজা নিঃশ্বাস নিয়েছিলাম বাইরে,খুবই ভালো লাগছিলো। ওর মনেও ছিলো খুশির ছোঁয়া,আমার সিঁদুরমাখা ঢলঢলে মুখটার থেকে যেন মুখ ফেরাতে পারছেনা। আমি কোথায় গিয়েছিলাম জানেন?সেই পুরোনো জায়গাতে যেতে খুব ইচ্ছে করছিলো মনটা শুধুই চাইছিলো একবার যেতে।
” নন্দন আমারও খুব প্রিয়,আসলে কলকাতার প্রাণকেন্দ্র তো এটাই। চলো ওখানে গিয়েই বরং কিছুক্ষণ বসি।”
বসতে চেয়েছিলাম আমাদের বহু স্মৃতি জড়ানো সেই পুরোনো জায়গাটায় নতুন কারো সাথে। চোখ ভিজে গিয়েছিলো ভাবতেই সবটা কিন্তু হঠাৎই ছিটকে পিছিয়ে এসেছিলাম। কাকে দেখছি এটা! রজত! ও একা এখানে বসে কি করছে?জায়গাটা একই,ও আছে আমি নেই। আমি আজ অন‍্য কারো সাথে এসেছিলাম খুঁজতে স্মৃতির নুড়ি পাথর। চোখাচোখি হয়ে গিয়েছিলো রজতের সাথে। যাকে মনে মনে কত খুঁজেছি,আজ আর তাকাতে ইচ্ছে করলোনা ওর মুখের দিকে। মনে হচ্ছিলো মাটিটা যদি ভাগ হয়ে যেত আমি সেখানে ঢুকে যেতাম। মাথাটা নিচু করে সরে এসেছিলাম। তবুও পারিনি,চলে যেতে যেতে একবার পেছন ফিরে দেখেছি কিন্তু আর ওকে দেখতে পাইনি। আশ্চর্য হয়েছিলো আমার স্বামী আমার চোখমুখ দেখে। বলেছিলাম শরীরটা হঠাৎই খুব খারাপ লাগছে বাড়ি যাবো।
“এতক্ষণ তো ঠিক ছিলে হঠাৎ কি হলো? বসতে চাইলে একটু। তাহলে কি বসবে কোথাও? এই নাও একটু জল খাও।”
সেদিন ফিরেছিলাম বাড়িতে প্রায় টলতে টলতে। রাতে ও খুব কাছে এসে মাথাতে হাত বুলিয়ে দিতে চাইলে বলেছিলাম ঘুমোও আমি ঠিক আছি। শুধু মনে হয়েছিলো রজত বোধহয় ভালো নেই,হয়ত কোথাও একটা ভুল হয়ে গেছে। কিন্তু আর কিছু করার নেই,ও তো ফিরিয়ে দিয়েছিলো সত‍্যিই আমাকে।
দিনগুলো কাটছিলো কেমন যেন বিভ্রান্ত হয়ে,আমার স্বামীর পরিবারের লোকজন ওকে বিয়ে দিতে চায়নি শুধু সম্পত্তির কারণে,ও নিজের চেষ্টায় অনেক কিছু করেছিলো তা হাতছাড়া হয়ে যাবার ভয়ে কেউ বিয়ে দিতে চায়নি।একটা সময় অনেক কিছু ছেড়ে বেড়িয়ে এসেছিলো। তাই সবসময় বলতো,” তুমি কোয়ালিফিকেশন বাড়াও চাকরি করো।একসাথে পা ফেলবো দুজনে।”অদ্ভুত মনের জোর পেতাম। দুবছর সব ভুলে পড়াশোনা করে চাকরি পেলাম। শুরু হলো আমার নতুন জগত, এলো সন্তান তার পরে। ডুবে গেলাম পুরোপুরি সংসারে আর কাজের জগতে। চাইলাম ভুলে যেতে আর ভালো রাখতে সবাইকে।
সত‍্যিই কি সবটা ভোলা যায়?তাই হয়ত আমিও ভুলিনি। মনে পড়ত রজতের জন্মদিনের তারিখটা ঠিক। লুকিয়ে বলতাম ও ভালো থাকুক,সুখে থাকুক। মন পাখিকে পোষ মানিয়েছিলাম একটু একটু করে। স্বামী উজাড় করে দিতো সম্মান আর ভালোবাসা। বলতো,”সবসময় সেজেগুজে থাকবে,ভালো থাকবে। আমি তো তোমার হাসিমুখের দিকেই তাকিয়ে ভালো থাকি।”
ভালো লাগতো ভেবে এই তো সবাইকে ভালো রেখে ভালো আছি আমি। হয়ত বা সুখ উপচে পড়ছে আমার শরীর মনে।
কেটে গেছে এই করে তেইশ বছর হয়ত বা না গোনা আরো কয়েকটা মাস। ছেলেই ফেসবুকে আ্যকাউন্ট খুলে দিয়েছিলো,কাজের ব‍্যস্ততা শাশুড়িমায়ের শরীর খারাপ এই নিয়ে খুব একটা সময় পেতামনা। হোয়াটসআ্যপ দেখতাম মাঝে মাঝে।
ফেসবুক বুঝতে বুঝতেই দেখলাম বন্ধু হতে চেয়েছে বেশ কয়েকজন, ছবিগুলো দেখছিলাম হঠাৎই আঙুলটা আটকে গেলো…রজত!। পাগলের মতো খানা তল্লাশি করলাম প্রোফাইলটা। দেখলাম কিছু ছবি,সুনীতার আর ওর মেয়ের।কিন্তু পারলামনা,সত‍্যিই পারলামনা আমার নষ্ট প্রেমকে আঙুলের ছোঁয়ায় ডিলিট করে দিতে। তোমরা হয়ত ভাবছো আমি সত‍্যিই খুব খারাপ তবুও ওকে নিলাম বন্ধু করে আবার। চোরাকুঠুরীর দরজাটা খুলে গেলো আবার অনেক অনেক বছর পর। মুখোমুখি প্রেমের মানুষ এলো মুখপত্রিকায়।
দুজনের মনের কত কথা,মান অভিমান আর অভিযোগ টুকরো শব্দ হয়ে ঝরে পড়লো ইনবক্সে। ও বললো,” আমি বাধ‍্য হয়েছিলাম তুমি বোঝোনি। আমার ভবিষ‍্যৎ কিছু ছিলোনা। কিন্তু তুমি আগে বিয়ে করেছিলে। সেদিন নন্দনে দেখেছিলাম সুখ চুইয়ে পড়ছিলো তোমার সমস্ত শরীর দিয়ে।খুব কেঁদে ছিলাম সেদিন।”
বাইরের চোখ দিয়ে কি আর মনের অসুখ দেখা যায়? আর তুমি,তুমি যে এতো ঘটা করে বড় প‍্যান্ডেল বেঁধে সুনীতাকে বিয়ে করেছিলে সেই বেলা?আমি শুনেছি রজত। খুব মন কেঁদেছিলো সেইদিন। এতো ঘটা করে যখন সুনীতাকে সিঁদুর পরালে একবারও আমার কথা মনে পড়েনি।
“কি করবো বলো,সুনীতা একমাত্র মেয়ে। ওর মা বাবার ইচ্ছেতেই বড় করে বিয়েটা হয়েছিলো। আর ওকে সিঁদুর পরানোর সময় তোমার মুখটাই
মনে ভেসে উঠেছিলো।”
সত‍্যি তুমি কত মিথ‍্যে আজও বলতে পারো গুছিয়ে।

“আমি তোমাকে আজও ওখানেই রেখেছি মোমের পুতুল যেখানে ছিলে।”
হাসি পেয়েছিলো অনেক বছর বাদে ডাকটা শুনে,মনে হয়েছিলো প্রতারক। তবুও দূর্বল হয়ে গিয়েছিলাম। গল্প করতাম সময় পেলেই,নেশা,বিশ্বাস করো নেশা হয়ে গিয়েছিলো আমার। আবার আবার আমার যত্নে গড়ে তোলা সুখী গৃহকোণে নষ্ট ভালোবাসার উইপোকাটাকে আমি ঢুকতে দিয়েছিলাম।
কত কথা বলতো,” জানো মোমেরপুতুল তোমার দেওয়া সেই বইগুলো আর নেই। সব সুনীতা দূর করে দিয়েছে। সুনীতা আমাকে ভালোবাসেনা আমার টাকাকে ভালোবাসে।”
হেসে বলেছিলাম অথচ এই সুনীতাদের বাড়িতেই ঘরজামাই হয়ে থেকে গিয়েছিলে তুমি।
“বিশ্বাস করো আমার উপায় ছিলোনা,এখনো শুধু মেয়েটার জন‍্য আছি।ওর বিয়ে হয়ে গেলে চলে যাবো কোথাও।”
বিশ্বাস না করতে চাইলেও বিশ্বাস করেছিলাম। দেখা করেছিলাম বরকে বলেই,বলেছিলাম কলেজের বন্ধু অনেকদিন বাদে ফেসবুকে দেখা হয়েছে তাই মুখোমুখি একবার দেখা করবো। ও আর কিছু তেমন জানতে চায়নি,অফিস যাওয়ার পথে রজতের অফিসের কাছে নামিয়ে দিয়ে চলে গিয়েছিলো।
আমাকে দেখে রজতের চোখেমুখে মুগ্ধতা দেখেছিলাম। কিছুটা বিষণ্ণতাও ছিলো আমার সুখের পাশাপাশি নিজের অসুখটাকে হয়ত আরও বেশি করে দেখে।
ও যত বেশি নিজের অসুখী জীবনের কথা বলেছিলো তত বেশি আমি দূর্বল হয়েছিলাম। নিজের সুখের ক‍্যানভাসে রঙতুলি দিয়ে নতুন কিছু আঁকতে ওর কথা মনে হত দুঃখ পেতাম। আবার কখনো ভাবতাম ঠিকই হয়েছে,এটাই ওর পাওনা ছিলো। একটু একটু করে দূর্বলতা বাড়ছিলো আমার। নিজের স্বামীর দিকে তাকিয়ে মনে হত আমার ভগবানকে যেন না ঠকাই ঠাকুর সেই শক্তি আমাকে দিয়ো,কিন্তু মনের মধ‍্যে পরপুরুষের কথা নিয়ে কি পুজো করবো ভগবানের? কিন্তু রজত তো অনেক আগে থেকে আমার জীবনে ছিলো,তাই পাপ হবে কেন? আর পরপুরুষই বা কেন?
বড্ড চাপ লাগছিলো মনে,অস্থির হচ্ছিলো তাইতো আজ তোমাদের যেমন সবটা বলছি তেমনি বললাম শোভাকে।শোভা আমার বন্ধু,খুব ভালো কথা বলে। কিছুটা জানেও আমার সব অতীতের কথা।
ও বললো,” বিপাশা, আমি জানি তোর খারাপ লাগবে তবে আমি হলে ঐ ফেলে আসা সম্পর্ককে নিজের জীবনে কখনও ঢুকতে দিতামনা। তুই নিজেকে ঠকাচ্ছিস নিজের কাজের পক্ষে যুক্তি খাড়া করে। একদিন রজতের জীবনে দাঁড়ানোর জন‍্য সুনীতাকে দরকার ছিলো তখন ঐ সুযোগটা নিয়েছে। আজ ওর অনেক টাকা,সুনীতা এখন পুরোনো,খিটখিটে হয়ত বা রুগ্ন। সেই তুলনায় তুই ঝকঝকে স্মার্ট,চাকরি করিস। বৌ আর বান্ধবী দুজনকেই রাখতে চাইছে। এটা পুরুষদের অনেক পুরোনো অসুখ,ঘর আর হারেম,পত্নী আর উপপত্নী সবটাই চাই।অবশ‍্য শুধু পুরুষদের কথাই বা বলি কেন অসুখে সুখে কখনো বা অভ‍্যেসে আমরা মেয়েরাও একাধিক সম্পর্কের শিকার।”
শোভা তুই একটু বুঝতে চেষ্টা কর,আমিও তো ওকে ভালোবাসি। আমার বর আসার অনেক আগে থেকে ও ছিলো। এটা কোন পরকীয়া প্রেম নয়।
“তাহলে বিয়ে করলি কেন?সারাজীবন একা কাটাতে পারতি? আর তাহলে তোর মন এত কিছু ভাবছেই বা কেন?সঠিক,বেঠিক?”
বিশ্বাস কর তখন আমার কোন উপায় ছিলোনা।

“এখনও উপায় নেই বিপাশা,সন্তানের কাছে ছোট হয়ে যাওয়ার চেয়ে বড় লজ্জা বোধহয় কিছুই নেই। তোর সুখী গৃহকোণ ছেড়ে কোথায় পা রাখছিস এই বয়েসে?এখন এটাই তোর ভালোবাসার ঘর,আর বিদ‍্যুতদা মন্দবাসার বর। তুই বিদ‍্যুৎদাকে কতটা ভালোবাসিস জানিনা,হয়ত শুধুই কৃতজ্ঞ। তবে বিদ‍্যুতদা তোকে ভালোবাসে বলেই তোর অসুখে এত সেবা করেছে।তোকে ভালো দেখতে চায়,তোর ব্লাউজ নিজে আয়রন করে দেয়।”
শোভা অফলাইনে চলে যায়। আমিও মোবাইলটা বন্ধ করি,ও অঘোরে ঘুমোচ্ছে,আমার গায়ে পরম নির্ভরতায় হাতটা রেখে। আমার চোখদুটো তখন খুব ভেজা। শোভার প্রতিটা কথা মনে ছুঁচের মত বিঁধতে থাকে। আমার কিছু কথা টাইপ করি শোভাকে। ঘুম এসে যায় একসময়।
শোভা মেসেজ করে,আমিও অন হই।
” তোর লেখাগুলো পড়লাম, বারবারই রজতকে খুব ভালোবাসিস লিখেছিস। ভুলতে পারিসনি।”
যা সত্যি তাই লিখেছি,জানিস ও একটুও সুখী নয়। সুনীতার সাথে অনেকদিন কোন সম্পর্ক নেই।
” তুই ওদের বেডরুমে যাস বোধহয় রাতে? আচ্ছা শোন তুই রজতকে বলিস তুই সব ছেড়ে ওর সাথে চলে গিয়ে আবার নতুন করে সব শুরু করতে চাস। রজত তো বলেছে তোকে এখনো ভালোবাসে। কি দরকার দুই নৌকায় পা দিয়ে চলার। জীবনের শুরুতে নাইবা হলো,শেষেই সুখে থাক তোরা। তাছাড়া দুজনেরই তো ছেলেমেয়ে বড় হয়ে গেছে অনেকটা কর্তব‍্য শেষ। না পাওয়া স্বপ্নগুলো না হয় দেখবি নতুন করে..তোর বেনারসী পরে কনে সাজার স্বপ্ন।”
শোভার কথা শুনে অবাক লাগে,কিছু কথা শেয়ার করেছিলাম তাই বলে এই রকম উত্তর! কিন্তু কথাগুলো হয়ত ঠিকই। তবুও বললাম শোন ওকে বলেছি যদি আগে যাই সিঁদুর, বেনারসী আর চন্দনে সাজিয়ে দিয়ো। ছেলেকেও বলেছি তাই।
“সত‍্যিই বিপাশা তুই এখনো ছেলেমানুষ, মৃত্যুর পর কিছু দেখার নেই,পাওয়ার নেই। কি এসে যায় চন্দন,বেনারসী বা ছেঁড়া কাপড়ে?”
শোভা অফ হয়ে যায় তবুও বারবার মনে হয় ওকে খুব ভালোবাসি, কখনো ভুলতে পারবোনা।তবুও মনে হলো রজতকে আজ বলবো শোভার শেখানো কথাগুলোই।
মাঝে একটা স্ক্রীন,মুখোপত্রিকায় আমরা মুখোমুখি আবার…রজতের কথায় বারবারই ছিলো ওর অসুখী প্রাচুর্যে ভরা জীবনের গল্প.. আমি বললাম চলো এইসব ছেড়ে আমরা নতুন করে সব শুরু করি,ছেলেমেয়ে,সংসার এইসব তো অনেক ভাবলাম। এবার শুধু তুমি আর আমি আবার দেখবো আমাদের পুরোনো স্বপ্নগুলো নতুন করে। তুমি একবার বললে আমি ছাড়বো সব,কিন্তু আগে তুমি ছাড়বে তোমার অসুখী দাম্পত‍্য। বলো,কথা দাও।
থমকে গিয়েছিলো রজত অনেকক্ষণ কোন উত্তর পাইনি। অনেক দেরীতে পেয়েছিলাম দীর্ঘ সংলাপ,” আমার মেয়েটা যে খুব ভালোবাসে আমাকে মোমের পুতুল।ওর মধ‍্যে যে আমি তোমাকে দেখি। ও এখনো ছোট। আমি হঠাৎ এরকম পদক্ষেপ নিলে ওর জীবনটা যে নষ্ট হয়ে যাবে। তারপর তোমার ছেলে,ওর কি হবে ভেবেছো? তবে এটা ঠিকই তোমার বরের পাশে সত‍্যিই তোমাকে মানায়না। আমার মেয়ে কিছুটা জানে আমাদের কথা,মেয়ে বলে তোমার বন্ধুকে তুমি পরের জীবনে পাবে ঠিক।”
মেসেজ পড়ে মাথাটা গরম হয়ে গিয়েছিলো,শোভা হয়ত চোখে আঙ্গুল দিয়ে অনেক কিছুই দেখালো। সত‍্যিই বোধহয় আজও বড় ছেলেমানুষ আমি। ভালোবাসাটা মনেই থাক তবে প্রেমটা বোধহয় সত‍্যিই নষ্ট হয়ে গেছে বাসী ভাত তরকারির মত।
আমি বিপাশা,দাস,মজুমদার না সেন কোনটাই ম‍্যাটার করেনা। আজ বিদ‍্যুতের কথাগুলোই বড় সত‍্যি মনে হলো প্রত‍্যেকটা মেয়ের বোধহয় বাঁচা দরকার নিজের জন‍্য,নিজেকে প্রস্তুত করা উচিত মানসিক আত্মনির্ভরতায়। মন চাইলে বৈধব‍্যেও পরা উচিত বেনারসী। তাই আর মৃত‍্যুর পরের জন‍্য নয় ফালতু সেন্টিমেন্টকে অনুতাপের আগুনে পুড়িয়ে আমিও সাজবো নিজের মত। নিজের ইচ্ছেগুলোকে বাঁচিয়ে ভালো রাখবো নিজেকে শুধু শুধু নিজের জন‍্য।
সমাপ্ত:-

রুমাশ্রী সাহা চৌধুরী

আমি বিপাশা,এখন মানে প্রায় পঁচিশ বছর আগে বিপাশা দাস থেকে মজুমদার হয়েছি। চাকরি করি,একমাত্র ছেলে স্বামী আর শাশুড়িমাকে নিয়ে আমার সুখের সংসার শাশুড়িমা কিছুদিন যাবৎ অসুস্থ ছিলেন ওনাকে ঘিরে ছিলো অনেকটা ব‍্যস্ততা। সেইসময় আমার মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করে বলেছিলেন,” আসছে জন্মে যেন তোর মেয়ে হয়েই আসি। সত‍্যিই তুই আমার মা।”
আমার ছেলে সৌরভ আমার ভালো বন্ধু,এখন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে। আজকাল একটু কম সময় পায়। তবুও রাতে জমিয়ে একটা আড্ডা হয় আমাদের খাবার টেবিলে। আমার বর বিদ‍্যুতকে কি বলবো?..অভিভাবক,বন্ধু,আমার সবচেয়ে হিতাকাঙ্খী না ভগবান? ও না থাকলে বোধহয় আমার উচ্চশিক্ষা চাকরি কিছুই হতোনা।
সত‍্যিই আমি খুব খুব সুখী। খুব কথাটা দুবার বললাম,আসলে আমার মনে কি আছে তা বোধহয় আমি নিজেই খুঁজে বেড়াই আজও, কখনো ব‍্যস্ত সকালে কখনো বা ক্লান্ত বিকেলে। না না মনে কিছু নেই,কি আবার থাকবে? বিশ্বাস করুন আমি ওকেই খুব ভালোবাসি আর শ্রদ্ধা করি।
আমি গ্ৰামের মেয়ে,আমরা বেশ কয়েকজন ভাইবোন,তবুও পড়াশোনার জন‍্য বাবার কম ক্ষমতা থাকলেও কলকাতা শহরের বাংলা মিডিয়ামে ভর্তি করে দিয়েছিলেন আমাকে, হস্টেলেই থাকতাম। তবুও প্রেম হয়ে গিয়েছিলো কোন এক সরস্বতীপুজোর দিনে ওর সাথে। আমার হলুদ শাড়ি আর খোলাচুলে বন্দী হয়েছিলো রজতের মন। তাই কড়াকড়ির ঘেরাটোপ ছাড়িয়ে একটু দেখা,কখনো লুকিয়ে কথা বা লুকোনো চিঠিতে আমি রজতের প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম। আমার সবটুকুই তখন রজত আর আমি ওর মোমের পুতুল। ঐ নামেই আমাকে ডাকতো ও,স্কুলের গন্ডী পেরিয়ে কলেজ,অনেকটা স্বাধীনতা। প্রেম আরেকটু বেশি গাঢ় তখন। খুব বই পাগল ছিলো রজত আমিও ভীষণ ভালোবাসতাম বই পড়তে আর বইবন্দী প্রেমে ভাসলো আমার মন। ওর জন্মদিনে বই ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারতাম না। ” ভালোবাসায় থেকো এমনি একদম আমার হয়ে সবসময়…তোমার মোমের পুতুল।”
কত বইয়ে যে লিখে দিয়েছি এমন। ওর চোখদুটো খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠতো,বলতো,” কি সুন্দর!লিখে দাও বইগুলোতে,আমার সবচেয়ে প্রিয় উপহার। সবসময় আমার কাছে থাকবে।”
অভিমান করে আমি বলতাম,” আর আমি? আমি থাকবোনা,সবসময় তোমার কাছে?”
মজা করে বলতো,” আমার মোমের পুতুল বৌ আর বই দুটোকেই একদম বুকের কাছে ধরে রাখবো।”ওর উষ্ণ আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরতো আমাকে আরো নিবিড়ভাবে।
রজতের বাড়িতে সেভাবে কখনোই আমার যাওয়া হয়নি। শুনেছি ওর কষ্টের শেষ ছিলোনা,ওর মত দুর্ভাগ্য বোধহয় কম মানুষেরই হয় আর ওর দুঃখের কথা শুনে যেন আরও বেশি ওর কাছে চলে এসেছিলাম। সবসময় বলতো,” তুমি তো জানো আমার মা ছোটবেলায় মারা গেছে,আমার নতুন মা আমাকে চাকরের মত খাটিয়েছে আর অত‍্যাচার করেছে। কখনো একটুও ভালোবাসা পাইনি। শুধু তুমি আমাকে একটু ভালোবেসো তাহলেই হবে। আমি ভালোবাসার কাঙাল তাই তো ছুটে ছুটে তোমার কাছে আসি। আর যাই বাবার বন্ধু মনতোষ কাকুদের বাড়ি,ওরা আমাকে খুব ভালোবাসে।”
ওর কষ্টের কথা শুনে আমার মনটা কেমন যেন হয়ে যেতো,ইচ্ছে করতো নিজের একদম কাছে ওকে রেখে সব ভালোবাসা উজাড় করে দিই।” খুব খুব ভালোবাসতাম ওকে খুউব। কত কথাই না হত ওর সাথে..তার মাঝেই শুনেছি মনতোষ কাকু আর সুনীতার কথা। বলত,” কাকু,কাকিমা খুব ভালো আমাকে অনেক ভালোবাসা দিয়েছেন। সুনীতা আমার ছোটবেলার বন্ধু,তবে তোমার মত সুন্দরী নয়। ও জানে আমাদের সব কথা।”
আমি রাগ করে বলেছিলাম অমন বলতে নেই,ভগবান সবার মধ‍্যেই সৌন্দর্য দিয়েছেন নিজের মত করে। ” সত‍্যিই মোমের পুতুল তোমার অনেক বড় মন।সুনীতাটা খুব পাজি জানো,আসলে ছোটবেলা থেকে চিনি ওকে তাই মাঝে মাঝেই বলে ও বাড়িতে তোমাকে কে আর ভালোবাসে। তুমি এই বাড়িতেই থেকে যাও। বাবা মা তোমাকে যা ভালোবাসে তোমাকেই সব দিয়ে দেবে। আর এত সম্পত্তি নিয়ে আমিই বা কি করবো?
আমার হঠাৎই বলে ফেলেছিলাম,দেখো হয়ত সুনীতাকে সমেত সবটাই তোমাকে মনতোষকাকু দিয়ে দেবেন। তাহলে আর তোমার কোন অভাবও থাকবেনা,কষ্টও থাকবেনা।
খুব রেগে গিয়েছিলো রজত সেদিন,” আর কোনদিন যেন এমন কথা না শুনি মোমের পুতুল,আমার সবটা জুড়ে শুধু তুমি।”
আমি আবেগে,ভালোবাসায় মাথা রেখেছিলাম পরম নির্ভরতায় ওর কাঁধে। ও কাছে টেনে বলেছিলো,” আমাকে একটু সময় দাও।”
কলেজের পর চাকরির চেষ্টা করে বেশ কয়েকটা ভালো চাকরির অফার পেয়েছিলাম বাইরে,কিন্তু আমি তখন রজতের প্রেমে ভাসছি। ভেবেছি ওকে ছেড়ে দূরে চলে গেলে কি করে থাকবো আমি? ছেড়ে দিয়েছিলাম এয়ার ইন্ডিয়ার চাকরির অফারটাও। বাড়ি থেকে তখন বিয়ের চেষ্টা করছে,সত‍্যিই হয়ত সেটাই স্বাভাবিক। আমার এভাবে বাইরে থাকা চাকরির চেষ্টা আর পড়াশোনা করার জন‍্য আর কতদিন ওরা মানবে?তবুও নানা বাহানায় অনেকদিন ওদের ঠেকিয়ে রেখেছি।
বেশ কয়েকদিন রজত আসেনা,কোন খবরও নেই,ওদের ল‍্যান্ডফোন নম্বরটা ছিলো। সাহস করে ফোন করলাম,এর আগে দু একবার করেছি। দুদিন অপরিচিত গলা শুনে ছেড়ে দিয়েছিলাম,কয়েকদিন বাদে ধরলো ওর ভাই বললো,”দাদা মনতোষকাকুদের বাড়িতে, ওনার শরীর খারাপ তাই গেছে।”
মনটা একটু শান্ত হলো জেনে,তবুও খুবই দরকার তখন ওকে আমার,কবে যে আসবে?আসলে তখন হস্টেল ভাঙার কথা হচ্ছে যেখানে আমি থাকতাম।
বেশ কয়েকদিন পরে ও এসেছিলো দেখা করতে প্রথমে আমার হস্টেলে ওখানে বেশি কথা হলোনা। তারপরে একদিন এলো নন্দনে আমাদের পরিচিত আর মন দেওয়া নেওয়ার সেই প্রিয় জায়গাটাতে।
কিন্তু ও কেন আমাকে মোমের পুতুল ডাকছে না? আজ ওর চোখেমুখে কেন নেই সেই ভালোবাসার পরশমাখা চাউনি?শুকনো গলায় বলেছিলাম,বাড়ি থেকে খুব দেখাশোনা করছে বিয়ের জন‍্য আসলে মায়ের শরীর ভালো নেই। ছোটবোনের ও সম্বন্ধ আসছে। এদিকে শুনছি হস্টেল ভাঙবে,ওরা নোটিশ দিয়েছে তাড়াতাড়ি হস্টেল ছাড়ার জন‍্য। চাকরিটাও নিলামনা তোমাকে ছেড়ে থাকতে হবে বলে। এখন আমি কি করবো,কিছুই বুঝতে পারছিনা। বাড়িতে যেতে আমি চাইছিনা,ওখানে গেলেই বিয়ে করে নিতে হবে,আর কোন অজুহাত দেবো। আরও হয়ত কিছু বলতাম কিন্তু বলা হলোনা।
” দ‍্যাটস্ ইয়োর প্রবলেম,আমি তোমাকে একবারও বলিনি চাকরির অফার ছাড়তে। সত‍্যিই তো এত ভালো চাকরি পেয়ে ছাড়লে কেন? তোমরা মেয়েরা সত‍্যিই পারো,হ‍্যাঁ দেখা করেছি গল্প করেছি তুমি আমার বন্ধু ছিলে। এখনও আছো তাই বলে এভাবে নিজের জীবনে ইচ্ছেমত আমাকে জড়াতে চাইছো কেন?”
আমার গলাটা বুজে আসে,ওর গলাতে এতটা বেশি প্রত‍্যাখ‍্যান ছিলো যে আমি কেমন যেন বোবা হয়ে যাই..কিন্তু আমি যে তোমার মোমের পুতুল,তুমি তো আমাকে স্বপ্ন দেখিয়েছিলে,বেনারসী পরে কনে দেখা আলোয় বৌ সাজার স্বপ্ন। তুমি কি সব ভুলে গেলে?
” একটু বেশি নাটক করছো না কি? আমার গল্পকে যদি তুমি সত‍্যি ভাবো দ‍্যাটস ইয়োর প্রবলেম। আবার বলছি,আমার চাকরির ঠিক নেই থাকার জায়গা নেই,বাড়িতে সৎমা।আমি অযথা তোমাকে নিজের অনিশ্চিত ভবিষ‍্যতে জড়াবো কেন শুনি?আমার আর কিছু বলার নেই। তুমি এবার বাড়ি যাও।”
লজ্জায়,অপমানে,ঘেন্নায় মাটির সাথে মিশে যেতে ইচ্ছে করছিলো।টলতে,টলতে বাড়ি ফিরেছিলাম প্রায় অসুস্থ হয়ে। খাওয়া,ঘুম সবই উঠে গিয়েছিল কদিন। বাড়ি থেকে খুবই বিয়ের তোড়জোড় করছিলো,বেশ কয়েকটা সম্বন্ধ এসেছিলো। মেজো জামাইবাবু বারবার বলছিলো এক বন্ধুর কথা। ওদের কোন দাবি নেই,শুধু একটা ভালো শিক্ষিত মেয়ে চাই। রাজি হতে হয়েছিলো আমায় বাড়িতে বলেছিলাম কোন অনুষ্ঠান কোরনা,রেজেস্ট্রী করে হবে বলে দিয়ো। মাসখানেকের মধ‍্যেই হঠাৎই আমার বিয়ে হয়ে গিয়েছিলো।শুধুই একটা সই আর কিছুনা,সিঁদুরটাও আমি পরিনি। হয়ত তোমরা সবাই ছিঃ ছিঃ করবে আমাকে। বলবে একটা নষ্ট চরিত্রের মেয়ে আমি,বিয়ে করলাম অথচ সিঁদুর পরলাম না। আমার স্বামী, কিনেছিলো শাড়ি গয়না কিন্তু পুরোনো পোশাকেই আমার বিয়ে হয়েছিলো। সিঁদুর পরানোর কথা হতেই আমি মাথা নেড়ে মাথা নামিয়েছিলাম ও হেসে বলেছিলো,”থাক পরে হবে,আসল তো সই,সেটাই তো হয়ে গেছে আবার কি?”
কনে দেখা আলোয় প্রথম কনের সাজে আমাকে দেখতে চেয়েছিলো রজত। সেই প্রতিশ্রুতির রঙে আর অন‍্য কারো সিঁদুরে রাঙাতে পারলামনা নিজেকে। কেমন যেন অদ্ভুত লেগেছিলো আমার স্বামীর আচরণে,আমার সমস্তটা ও মেনে নিয়েছিলো কোথাও কোন স্বামীত্ব বা জোর খাটায়নি। ওর উদারতার কাছে নিজেকে ছোট মনে হয়েছিলো,মনে হচ্ছিলো ওকে ঠকাচ্ছি না তো? বিবেক বলেছিলো না ঠকাইনি,আমি ভালোবেসেছিলাম অন‍্য কাউকে পরিস্থিতি আমায় বাধ‍্য করেছে অন‍্য সংসার পাততে, আর তারমধ‍্যে দোষের কি? এত সহজে কি এত বছরের ভালোবাসা ভুলে যাওয়া যায়?সব কিছুর মধ‍্যেই যেন রজতকেই দেখতে পাই।জানি তোমরা বলবে তাহলে আমি বিয়ে করলাম কেন? হয়ত আর কোন উপায় ছিলোনা আমার সেই সময়। বিশ্বাস করো আমি ঠকাতে চাইনি আমার বরকে,চেষ্টা করেছি মন দিয়ে সংসার করতে ওকে সুখী করতে। কিন্তু কি করে ভুলবো বড্ড পাগল পাগল লাগতো।
ফুলশয‍্যার রাত্রিটা দুজনের গল্পেই কেটে গিয়েছিলো, ও বেশি কথা বলেছিলো আমি বলেছিলাম কম। শুনেছিলাম ওর বাবার দুই বিয়ে,ওর মা দ্বিতীয় পক্ষের বৌ।সবসময় অত‍্যাচারিত হয়েছেন নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে করতে হত সবটা। তাই ও কখনো মেয়েদের ওপরে জোর খাটাতে চায়না। বিশ্বাস করে মেয়েদের ভালো থাকার জন‍্য আর্থিক স্বাধীনতা খুবই জরুরী। “তুমি কি কোন কারণে কষ্ট পেয়েছো?আমার জীবনেও অনেক কষ্ট,অনেক না পাওয়া। যা হয়েছে ভুলে গিয়ে আবার সবটা শুরু করো নতুন করে। পড়াশোনা আরও করো,তোমাকে উচ্চশিক্ষা পেতে হবে।”
আমি বলতে পারিনি আমার কি কষ্ট,ভয় পেয়েছিলাম। হয়ত বা যা পেয়েছি সবটাই হারানোর ভয়ে।
দেখতে দেখতে প্রায় একমাস হয়ে আসছিলো বিয়ের। একদিন সাজলাম,খুব সাজলাম,সিল্কের শাড়ি পরলাম,গয়না পরলাম মাথায় আঁকলাম সিঁদুরের রেখা। ওর চোখে দেখলাম মুগ্ধতা। মনকে বোঝালাম আর কতদিন শোক পালন করবো?এবার সব কালো ধুয়ে মুছে যাক সিঁদুরের রাঙা আভায়।
” খুব সুন্দর লাগছে আজ তোমায়। চলো কোথাও থেকে ঘুরে আসি। তেমনিভাবে কোথাও বেরোনো হয়নি আমাদের। কোথায় যাবে চলো?”
তাজা নিঃশ্বাস নিয়েছিলাম বাইরে,খুবই ভালো লাগছিলো। ওর মনেও ছিলো খুশির ছোঁয়া,আমার সিঁদুরমাখা ঢলঢলে মুখটার থেকে যেন মুখ ফেরাতে পারছেনা। আমি কোথায় গিয়েছিলাম জানেন?সেই পুরোনো জায়গাতে যেতে খুব ইচ্ছে করছিলো মনটা শুধুই চাইছিলো একবার যেতে।
” নন্দন আমারও খুব প্রিয়,আসলে কলকাতার প্রাণকেন্দ্র তো এটাই। চলো ওখানে গিয়েই বরং কিছুক্ষণ বসি।”
বসতে চেয়েছিলাম আমাদের বহু স্মৃতি জড়ানো সেই পুরোনো জায়গাটায় নতুন কারো সাথে। চোখ ভিজে গিয়েছিলো ভাবতেই সবটা কিন্তু হঠাৎই ছিটকে পিছিয়ে এসেছিলাম। কাকে দেখছি এটা! রজত! ও একা এখানে বসে কি করছে?জায়গাটা একই,ও আছে আমি নেই। আমি আজ অন‍্য কারো সাথে এসেছিলাম খুঁজতে স্মৃতির নুড়ি পাথর। চোখাচোখি হয়ে গিয়েছিলো রজতের সাথে। যাকে মনে মনে কত খুঁজেছি,আজ আর তাকাতে ইচ্ছে করলোনা ওর মুখের দিকে। মনে হচ্ছিলো মাটিটা যদি ভাগ হয়ে যেত আমি সেখানে ঢুকে যেতাম। মাথাটা নিচু করে সরে এসেছিলাম। তবুও পারিনি,চলে যেতে যেতে একবার পেছন ফিরে দেখেছি কিন্তু আর ওকে দেখতে পাইনি। আশ্চর্য হয়েছিলো আমার স্বামী আমার চোখমুখ দেখে। বলেছিলাম শরীরটা হঠাৎই খুব খারাপ লাগছে বাড়ি যাবো।
“এতক্ষণ তো ঠিক ছিলে হঠাৎ কি হলো? বসতে চাইলে একটু। তাহলে কি বসবে কোথাও? এই নাও একটু জল খাও।”
সেদিন ফিরেছিলাম বাড়িতে প্রায় টলতে টলতে। রাতে ও খুব কাছে এসে মাথাতে হাত বুলিয়ে দিতে চাইলে বলেছিলাম ঘুমোও আমি ঠিক আছি। শুধু মনে হয়েছিলো রজত বোধহয় ভালো নেই,হয়ত কোথাও একটা ভুল হয়ে গেছে। কিন্তু আর কিছু করার নেই,ও তো ফিরিয়ে দিয়েছিলো সত‍্যিই আমাকে।
দিনগুলো কাটছিলো কেমন যেন বিভ্রান্ত হয়ে,আমার স্বামীর পরিবারের লোকজন ওকে বিয়ে দিতে চায়নি শুধু সম্পত্তির কারণে,ও নিজের চেষ্টায় অনেক কিছু করেছিলো তা হাতছাড়া হয়ে যাবার ভয়ে কেউ বিয়ে দিতে চায়নি।একটা সময় অনেক কিছু ছেড়ে বেড়িয়ে এসেছিলো। তাই সবসময় বলতো,” তুমি কোয়ালিফিকেশন বাড়াও চাকরি করো।একসাথে পা ফেলবো দুজনে।”অদ্ভুত মনের জোর পেতাম। দুবছর সব ভুলে পড়াশোনা করে চাকরি পেলাম। শুরু হলো আমার নতুন জগত, এলো সন্তান তার পরে। ডুবে গেলাম পুরোপুরি সংসারে আর কাজের জগতে। চাইলাম ভুলে যেতে আর ভালো রাখতে সবাইকে।
সত‍্যিই কি সবটা ভোলা যায়?তাই হয়ত আমিও ভুলিনি। মনে পড়ত রজতের জন্মদিনের তারিখটা ঠিক। লুকিয়ে বলতাম ও ভালো থাকুক,সুখে থাকুক। মন পাখিকে পোষ মানিয়েছিলাম একটু একটু করে। স্বামী উজাড় করে দিতো সম্মান আর ভালোবাসা। বলতো,”সবসময় সেজেগুজে থাকবে,ভালো থাকবে। আমি তো তোমার হাসিমুখের দিকেই তাকিয়ে ভালো থাকি।”
ভালো লাগতো ভেবে এই তো সবাইকে ভালো রেখে ভালো আছি আমি। হয়ত বা সুখ উপচে পড়ছে আমার শরীর মনে।
কেটে গেছে এই করে তেইশ বছর হয়ত বা না গোনা আরো কয়েকটা মাস। ছেলেই ফেসবুকে আ্যকাউন্ট খুলে দিয়েছিলো,কাজের ব‍্যস্ততা শাশুড়িমায়ের শরীর খারাপ এই নিয়ে খুব একটা সময় পেতামনা। হোয়াটসআ্যপ দেখতাম মাঝে মাঝে।
ফেসবুক বুঝতে বুঝতেই দেখলাম বন্ধু হতে চেয়েছে বেশ কয়েকজন, ছবিগুলো দেখছিলাম হঠাৎই আঙুলটা আটকে গেলো…রজত!। পাগলের মতো খানা তল্লাশি করলাম প্রোফাইলটা। দেখলাম কিছু ছবি,সুনীতার আর ওর মেয়ের।কিন্তু পারলামনা,সত‍্যিই পারলামনা আমার নষ্ট প্রেমকে আঙুলের ছোঁয়ায় ডিলিট করে দিতে। তোমরা হয়ত ভাবছো আমি সত‍্যিই খুব খারাপ তবুও ওকে নিলাম বন্ধু করে আবার। চোরাকুঠুরীর দরজাটা খুলে গেলো আবার অনেক অনেক বছর পর। মুখোমুখি প্রেমের মানুষ এলো মুখপত্রিকায়।
দুজনের মনের কত কথা,মান অভিমান আর অভিযোগ টুকরো শব্দ হয়ে ঝরে পড়লো ইনবক্সে। ও বললো,” আমি বাধ‍্য হয়েছিলাম তুমি বোঝোনি। আমার ভবিষ‍্যৎ কিছু ছিলোনা। কিন্তু তুমি আগে বিয়ে করেছিলে। সেদিন নন্দনে দেখেছিলাম সুখ চুইয়ে পড়ছিলো তোমার সমস্ত শরীর দিয়ে।খুব কেঁদে ছিলাম সেদিন।”
বাইরের চোখ দিয়ে কি আর মনের অসুখ দেখা যায়? আর তুমি,তুমি যে এতো ঘটা করে বড় প‍্যান্ডেল বেঁধে সুনীতাকে বিয়ে করেছিলে সেই বেলা?আমি শুনেছি রজত। খুব মন কেঁদেছিলো সেইদিন। এতো ঘটা করে যখন সুনীতাকে সিঁদুর পরালে একবারও আমার কথা মনে পড়েনি।
“কি করবো বলো,সুনীতা একমাত্র মেয়ে। ওর মা বাবার ইচ্ছেতেই বড় করে বিয়েটা হয়েছিলো। আর ওকে সিঁদুর পরানোর সময় তোমার মুখটাই
মনে ভেসে উঠেছিলো।”
সত‍্যি তুমি কত মিথ‍্যে আজও বলতে পারো গুছিয়ে।

“আমি তোমাকে আজও ওখানেই রেখেছি মোমের পুতুল যেখানে ছিলে।”
হাসি পেয়েছিলো অনেক বছর বাদে ডাকটা শুনে,মনে হয়েছিলো প্রতারক। তবুও দূর্বল হয়ে গিয়েছিলাম। গল্প করতাম সময় পেলেই,নেশা,বিশ্বাস করো নেশা হয়ে গিয়েছিলো আমার। আবার আবার আমার যত্নে গড়ে তোলা সুখী গৃহকোণে নষ্ট ভালোবাসার উইপোকাটাকে আমি ঢুকতে দিয়েছিলাম।
কত কথা বলতো,” জানো মোমেরপুতুল তোমার দেওয়া সেই বইগুলো আর নেই। সব সুনীতা দূর করে দিয়েছে। সুনীতা আমাকে ভালোবাসেনা আমার টাকাকে ভালোবাসে।”
হেসে বলেছিলাম অথচ এই সুনীতাদের বাড়িতেই ঘরজামাই হয়ে থেকে গিয়েছিলে তুমি।
“বিশ্বাস করো আমার উপায় ছিলোনা,এখনো শুধু মেয়েটার জন‍্য আছি।ওর বিয়ে হয়ে গেলে চলে যাবো কোথাও।”
বিশ্বাস না করতে চাইলেও বিশ্বাস করেছিলাম। দেখা করেছিলাম বরকে বলেই,বলেছিলাম কলেজের বন্ধু অনেকদিন বাদে ফেসবুকে দেখা হয়েছে তাই মুখোমুখি একবার দেখা করবো। ও আর কিছু তেমন জানতে চায়নি,অফিস যাওয়ার পথে রজতের অফিসের কাছে নামিয়ে দিয়ে চলে গিয়েছিলো।
আমাকে দেখে রজতের চোখেমুখে মুগ্ধতা দেখেছিলাম। কিছুটা বিষণ্ণতাও ছিলো আমার সুখের পাশাপাশি নিজের অসুখটাকে হয়ত আরও বেশি করে দেখে।
ও যত বেশি নিজের অসুখী জীবনের কথা বলেছিলো তত বেশি আমি দূর্বল হয়েছিলাম। নিজের সুখের ক‍্যানভাসে রঙতুলি দিয়ে নতুন কিছু আঁকতে ওর কথা মনে হত দুঃখ পেতাম। আবার কখনো ভাবতাম ঠিকই হয়েছে,এটাই ওর পাওনা ছিলো। একটু একটু করে দূর্বলতা বাড়ছিলো আমার। নিজের স্বামীর দিকে তাকিয়ে মনে হত আমার ভগবানকে যেন না ঠকাই ঠাকুর সেই শক্তি আমাকে দিয়ো,কিন্তু মনের মধ‍্যে পরপুরুষের কথা নিয়ে কি পুজো করবো ভগবানের? কিন্তু রজত তো অনেক আগে থেকে আমার জীবনে ছিলো,তাই পাপ হবে কেন? আর পরপুরুষই বা কেন?
বড্ড চাপ লাগছিলো মনে,অস্থির হচ্ছিলো তাইতো আজ তোমাদের যেমন সবটা বলছি তেমনি বললাম শোভাকে।শোভা আমার বন্ধু,খুব ভালো কথা বলে। কিছুটা জানেও আমার সব অতীতের কথা।
ও বললো,” বিপাশা, আমি জানি তোর খারাপ লাগবে তবে আমি হলে ঐ ফেলে আসা সম্পর্ককে নিজের জীবনে কখনও ঢুকতে দিতামনা। তুই নিজেকে ঠকাচ্ছিস নিজের কাজের পক্ষে যুক্তি খাড়া করে। একদিন রজতের জীবনে দাঁড়ানোর জন‍্য সুনীতাকে দরকার ছিলো তখন ঐ সুযোগটা নিয়েছে। আজ ওর অনেক টাকা,সুনীতা এখন পুরোনো,খিটখিটে হয়ত বা রুগ্ন। সেই তুলনায় তুই ঝকঝকে স্মার্ট,চাকরি করিস। বৌ আর বান্ধবী দুজনকেই রাখতে চাইছে। এটা পুরুষদের অনেক পুরোনো অসুখ,ঘর আর হারেম,পত্নী আর উপপত্নী সবটাই চাই।অবশ‍্য শুধু পুরুষদের কথাই বা বলি কেন অসুখে সুখে কখনো বা অভ‍্যেসে আমরা মেয়েরাও একাধিক সম্পর্কের শিকার।”
শোভা তুই একটু বুঝতে চেষ্টা কর,আমিও তো ওকে ভালোবাসি। আমার বর আসার অনেক আগে থেকে ও ছিলো। এটা কোন পরকীয়া প্রেম নয়।
“তাহলে বিয়ে করলি কেন?সারাজীবন একা কাটাতে পারতি? আর তাহলে তোর মন এত কিছু ভাবছেই বা কেন?সঠিক,বেঠিক?”
বিশ্বাস কর তখন আমার কোন উপায় ছিলোনা।

“এখনও উপায় নেই বিপাশা,সন্তানের কাছে ছোট হয়ে যাওয়ার চেয়ে বড় লজ্জা বোধহয় কিছুই নেই। তোর সুখী গৃহকোণ ছেড়ে কোথায় পা রাখছিস এই বয়েসে?এখন এটাই তোর ভালোবাসার ঘর,আর বিদ‍্যুতদা মন্দবাসার বর। তুই বিদ‍্যুৎদাকে কতটা ভালোবাসিস জানিনা,হয়ত শুধুই কৃতজ্ঞ। তবে বিদ‍্যুতদা তোকে ভালোবাসে বলেই তোর অসুখে এত সেবা করেছে।তোকে ভালো দেখতে চায়,তোর ব্লাউজ নিজে আয়রন করে দেয়।”
শোভা অফলাইনে চলে যায়। আমিও মোবাইলটা বন্ধ করি,ও অঘোরে ঘুমোচ্ছে,আমার গায়ে পরম নির্ভরতায় হাতটা রেখে। আমার চোখদুটো তখন খুব ভেজা। শোভার প্রতিটা কথা মনে ছুঁচের মত বিঁধতে থাকে। আমার কিছু কথা টাইপ করি শোভাকে। ঘুম এসে যায় একসময়।
শোভা মেসেজ করে,আমিও অন হই।
” তোর লেখাগুলো পড়লাম, বারবারই রজতকে খুব ভালোবাসিস লিখেছিস। ভুলতে পারিসনি।”
যা সত্যি তাই লিখেছি,জানিস ও একটুও সুখী নয়। সুনীতার সাথে অনেকদিন কোন সম্পর্ক নেই।
” তুই ওদের বেডরুমে যাস বোধহয় রাতে? আচ্ছা শোন তুই রজতকে বলিস তুই সব ছেড়ে ওর সাথে চলে গিয়ে আবার নতুন করে সব শুরু করতে চাস। রজত তো বলেছে তোকে এখনো ভালোবাসে। কি দরকার দুই নৌকায় পা দিয়ে চলার। জীবনের শুরুতে নাইবা হলো,শেষেই সুখে থাক তোরা। তাছাড়া দুজনেরই তো ছেলেমেয়ে বড় হয়ে গেছে অনেকটা কর্তব‍্য শেষ। না পাওয়া স্বপ্নগুলো না হয় দেখবি নতুন করে..তোর বেনারসী পরে কনে সাজার স্বপ্ন।”
শোভার কথা শুনে অবাক লাগে,কিছু কথা শেয়ার করেছিলাম তাই বলে এই রকম উত্তর! কিন্তু কথাগুলো হয়ত ঠিকই। তবুও বললাম শোন ওকে বলেছি যদি আগে যাই সিঁদুর, বেনারসী আর চন্দনে সাজিয়ে দিয়ো। ছেলেকেও বলেছি তাই।
“সত‍্যিই বিপাশা তুই এখনো ছেলেমানুষ, মৃত্যুর পর কিছু দেখার নেই,পাওয়ার নেই। কি এসে যায় চন্দন,বেনারসী বা ছেঁড়া কাপড়ে?”
শোভা অফ হয়ে যায় তবুও বারবার মনে হয় ওকে খুব ভালোবাসি, কখনো ভুলতে পারবোনা।তবুও মনে হলো রজতকে আজ বলবো শোভার শেখানো কথাগুলোই।
মাঝে একটা স্ক্রীন,মুখোপত্রিকায় আমরা মুখোমুখি আবার…রজতের কথায় বারবারই ছিলো ওর অসুখী প্রাচুর্যে ভরা জীবনের গল্প.. আমি বললাম চলো এইসব ছেড়ে আমরা নতুন করে সব শুরু করি,ছেলেমেয়ে,সংসার এইসব তো অনেক ভাবলাম। এবার শুধু তুমি আর আমি আবার দেখবো আমাদের পুরোনো স্বপ্নগুলো নতুন করে। তুমি একবার বললে আমি ছাড়বো সব,কিন্তু আগে তুমি ছাড়বে তোমার অসুখী দাম্পত‍্য। বলো,কথা দাও।
থমকে গিয়েছিলো রজত অনেকক্ষণ কোন উত্তর পাইনি। অনেক দেরীতে পেয়েছিলাম দীর্ঘ সংলাপ,” আমার মেয়েটা যে খুব ভালোবাসে আমাকে মোমের পুতুল।ওর মধ‍্যে যে আমি তোমাকে দেখি। ও এখনো ছোট। আমি হঠাৎ এরকম পদক্ষেপ নিলে ওর জীবনটা যে নষ্ট হয়ে যাবে। তারপর তোমার ছেলে,ওর কি হবে ভেবেছো? তবে এটা ঠিকই তোমার বরের পাশে সত‍্যিই তোমাকে মানায়না। আমার মেয়ে কিছুটা জানে আমাদের কথা,মেয়ে বলে তোমার বন্ধুকে তুমি পরের জীবনে পাবে ঠিক।”
মেসেজ পড়ে মাথাটা গরম হয়ে গিয়েছিলো,শোভা হয়ত চোখে আঙ্গুল দিয়ে অনেক কিছুই দেখালো। সত‍্যিই বোধহয় আজও বড় ছেলেমানুষ আমি। ভালোবাসাটা মনেই থাক তবে প্রেমটা বোধহয় সত‍্যিই নষ্ট হয়ে গেছে বাসী ভাত তরকারির মত।
আমি বিপাশা,দাস,মজুমদার না সেন কোনটাই ম‍্যাটার করেনা। আজ বিদ‍্যুতের কথাগুলোই বড় সত‍্যি মনে হলো প্রত‍্যেকটা মেয়ের বোধহয় বাঁচা দরকার নিজের জন‍্য,নিজেকে প্রস্তুত করা উচিত মানসিক আত্মনির্ভরতায়। মন চাইলে বৈধব‍্যেও পরা উচিত বেনারসী। তাই আর মৃত‍্যুর পরের জন‍্য নয় ফালতু সেন্টিমেন্টকে অনুতাপের আগুনে পুড়িয়ে আমিও সাজবো নিজের মত। নিজের ইচ্ছেগুলোকে বাঁচিয়ে ভালো রাখবো নিজেকে শুধু শুধু নিজের জন‍্য।
সমাপ্ত:-

এই নিউজটি শেয়ার করুন...

Website Design & Developed By MD Fahim Haque - Web Solution