• রাত ১২:০৮ মিনিট রবিবার
  • ২রা আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
  • ঋতু : বর্ষাকাল
  • ১৬ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ
এই মাত্র পাওয়া খবর :
হোসেনপুর গরুর হাটে কিশোর গ্যাং এর হামলা, নগদ টাকা মোবাইল ও গরু ছিনতাই, আহত ৫ হোসেনপুর গরুর হাটে কিশোর গ্যাং এর হামলা, নগদ টাকা মোবাইল ও গরু ছিনতাই, আহত ৫ নাছির মেম্বারের পথে ছেলে রাসেল, তাকে রুখবে সাধ্যকার সোনারগাঁয়ের চাঞ্চল্যকর রাব্বি হত্যা মামলার ২ আসামি গ্রেফতার মেঘনা টোল প্লাজায় তিশা বাসে আগুন বন্দরে বকেয়া বেতনের দাবিতে ২ ঘন্টা মহাসড়ক অবরোধ,  সোনারগাঁয়ে ৩ মিষ্টির দোকানকে ১৫ হাজার টাকা জরিমানা সোনারগাঁয়ে নদী থেকে অজ্ঞাত লাশ উদ্ধার সোনারগাঁয়ে মাদকের টাকা লেনদেনের জেরে এক যুবককে কুপিয়ে হত্যা বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে সোনারগাঁও প্রেস ক্লাবে আলোচনা সভা সোনারগাঁয়ে আ.লীগ নেতার প্রতারণার নতুন ফাঁদ অনিয়ম ও দূর্নীতি যেন সমাজ ব্যবস্থায় স্বাভাবিক ঘটনা. জিএম কাদের কাল থেকে শ্রী শ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারীর ১৩৪ তম তিরোধান উৎসব শুরু সোনারগাঁয়ে ডিম ছিনতাইয়ের ঘটনায় গ্রেপ্তার ২ সোনারগাঁ উপজেলা নির্বাচনীকে কেন্দ্র করে ঘোড়া প্রতিকের সমর্থকের পুকুরে বিষ প্রয়োগ সোনারগাঁ উপজেলা নির্বাচনীকে কেন্দ্র করে ঘোড়া প্রতিকের সমর্থকের পুকুরে বিষ প্রয়োগ সোনারগাঁয়ে অ্যাম্বুলেন্স দূর্ঘটনার নিহত -১ উপজেলা নির্বাচনে ঘোড়া প্রতিকের নির্বাচন করায় গাছ কর্তন নব নির্বাচিতত উপজেলা চেয়ারম্যানকে নিয়ে এতিমদের দোয়া সোনারগাঁয়ে ট্রান্সফরমার চুরির সময় স্বেচ্ছাসেবকলীগ নেতাসহ আটক-৪
বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা দর্শনঃ শিক্ষার লক্ষ্য ও উন্নত বাংলাদেশ

বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা দর্শনঃ শিক্ষার লক্ষ্য ও উন্নত বাংলাদেশ

Logo


বাঙ্গালী জাতীর মুক্তির কারীগর ও বাঙ্গালীর স্বপ্নদষ্টা জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। একটি সদ্যপ্রসুত দেশকে নিয়ে যিনি মহাপরিকল্পনা করেছিলেন কিভাবে দেশকে একটি সমৃদ্ধ অর্থনৈতিক শক্তিশালী দেশে পরিণত করা যায়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সব সময় চেয়েছেন এই দেশের মানুষ যেন খেয়েপরে সুখে শান্তিতে বেঁচে থাকতে পারে, আতœমর্যাদা নিয়ে যেন বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে। এই খেয়ে পরে বেঁচে থাকা আর আতœমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। সদ্য স্বাধীন দেশে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলেও তিনি এদেশের প্রথম বাজেটে প্রতিরক্ষা খাত থেকেও বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন শিক্ষাখাতে। কারণ তিনি কেবল রাজনীতিবিদ, রাষ্ট্রনায়কই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন শিক্ষা দার্শনিকও।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুবিবুর রহমান ছিলেন একজন আপাদমস্তক রাজনীতিবিদ যাঁর আজীবন লালিত স্বপ্ন ছিল একটি শোষণ ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। রাজনীতির বাইরেও বঙ্গবন্ধু শিক্ষা ও শিক্ষা স¤পর্কিত বিষয়ে অত্যন্ত আন্তরিক ছিলেন। ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু প্রদত্ত বিভিন্ন ভাষণ, আওয়ামী লীগের ঘোষিত কর্মসূচি, ১৯৭০ এর নির্বাচনী ইশতেহার, বাহাত্তরের সংবিধানে ঘোষিত শিক্ষা স¤পর্কিত ধারা এবং কুদরাত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশনের প্রতিবেদন থেকে বঙ্গবন্ধুর শিক্ষার প্রতি আগ্রহ ও মমত্ববোধের সু¯পষ্ট প্রতিফলন ফুটে উঠে। বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা ভাবনার বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায় ১৯৭২-১৯৭৫ সাল পর্যন্ত তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপসমুহের মাধ্যমে ।
জাতীয় বাজেটে শিক্ষা বরাদ্দ ও জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনঃ ২০১৯-২০ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট নানাবিধ কারণে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই বাজেট উপস্থাপনায় মাননীয় অর্থমন্ত্রী তাঁর বাজেট বক্তৃতার প্রথমেই উল্লেখ করেছেন, স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তি এবং মহান নেতা শতাব্দীর শ্রেষ্ট বাঙ্গালী জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর ১০০ তম জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের প্রস্তুতি হিসেবে একটি সুখী সমৃদ্ধ আগামীর বাংলাদেশ বিনির্মাণে এই বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে। তাই আলোচ্য নিবন্ধে জাতির জনকের শিক্ষা চিন্তার আলোকে বর্তমান বাজেটের শিক্ষা বরাদ্দের বিভিন্ন দিক, সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ আলোচিত হয়েছে। শতাব্দীর মহানায়ক জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আধুনিক বাংলাদেশ তথা তাঁর স্বপ্নের সোনার বাংলা বির্নিমানে শিক্ষার একটি দর্শন প্রবর্তন করেছিলেন, যা বর্তমান সময়েও অমূল্য বলে বিবেচিত হতে পারে। কিন্তু জাতির দূর্ভাগ্য, ১৯৭৫ সালের হৃদয় বিধারক ঘটনার পরে আজ অবধি শিক্ষা সংস্কারে এই অমূল্য দিকদর্শন পুরোপুরি স্টাডি হয়নি বা প্রতিষ্ঠার বৃহৎ আকারের কোন গবেষণা দেখা যায়নি। ভারতের জাতির জনক মাহাত্মা গান্ধীর শিক্ষা দর্শন প্রতিষ্ঠার জন্য অনেক ইনস্টিটিউট গড়ে তুলে ব্যাপক গবেষণা হয়েছে এবং হচ্ছে। এক্ষেত্রে আমরা পিছিয়ে রয়েছি।
বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা দর্শনের মূলে যদি আমরা দেখি, তাহলে দেখবো “একটি বৈষম্যহীন শোষণহীন উন্নত রাষ্ট্রব্যবস্থা” প্রবর্তনের জন্য আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ত ও প্রগতিশীল উৎপাদনমূখী দেশপ্রেমিক জনসমষ্টি সৃষ্টিতে শিক্ষাকে অভিযোজিতকরণের দিক নির্দেশনা। বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি দেশে ফিরে প্রথমে মনোযোগি হয়েছিলেন এই যুদ্ধবিধ্বস্থ দেশের শিক্ষাকে পূনর্গঠনের। তিনি ঘোষণা করেছিলেন, “শিক্ষাই হবে মুক্তির হাতিয়ার”। এই মুক্তি হবে সংকীর্ণতা থেকে মুক্তি, এই মুক্তি হবে মানবতার মুক্তি, এই মুক্তি হবে দরিদ্র শোষিত জনগণের মুক্তি, এই মুক্তি হবে দেশের অর্থনৈতিক মুক্তি। আর শিক্ষার মাধ্যমেই গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন তাঁর আজন্মলালিত স্বপ্নের সোনার বাংলা। এবারের বাজেটে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বাবদ ২৪ হাজার ৪১ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষায় আমরা ইতোমধ্যে আমরা ঈষর্ণীয় সাফল্য অর্জন করেছি। অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নের ক্ষেত্রেএই বরাদ্দ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে এবছর মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষাখাতকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এবারের বাজেটে ২০১৯-২০ অর্থবছরে শুধুমাত্র মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা খাতে উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা ২০১৮-১৯ অর্থবছরের উন্নয়ন বরাদ্দের তুলনায় ৫৪ শতাংশ বেশি। গত বছরের জুলাইয়ে এমপিওভুক্তির জন্য বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জনবলকাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০১৮ জারি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা ভাবনাঃ
১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ১৩ ডিসেম্বর দৈনিক ইত্তেহাদ পত্রিকায় “দৌলতপুর কলেজে ছাত্র সভা” শীর্ষক শিরোনামে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ১ ডিসেম্বর অধ্যক্ষদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই ছাত্র সভায় শিক্ষা সম্বন্ধে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, “শিক্ষাদীক্ষাই হলো মানব সভ্যতার মাপকাঠি, অথচ আমাদের দেশের অগণিত জনসাধারণকে অশিক্ষার অন্ধকারে ডুবিয়ে রেখে কোন মুখে আমরা বিশ্ব দরবারে নিজদিগকে সভ্য জাতি বলিয়া গৌরব করিব? আজ দেখতে পারছেন আমাদের সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই ধ্বসং হতে বসেছে। শিক্ষকদের বেতন না বাড়ালে শিক্ষা সমস্যার সমাধান অসম্ভব। শিক্ষা পদ্ধতির আমূল পরিবর্তন করা দরকার।” সিক্রেট ডকুমেন্টস অব ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ অন ফাদার অব দ্য নেশন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শিরোনামে ১৪ খন্ডের সংকলনের প্রথম খন্ডে (১৯৪৮ থেকে ১৯৫০) বঙ্গবন্ধুর এমন বক্তব্য উঠে এসেছে। বঙ্গবন্ধুর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন প্রতিষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলীম লীগের ম্যানিফেস্টোতে শিক্ষানীতি স¤পর্কে সু¯পষ্ট ঘোষণা ছিল-
“রাষ্ট্রের প্রত্যেকের শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠিত করিতে হইবে। শিক্ষা ব্যবস্থা রাষ্ট্রের হাতে থাকিবে এবং প্রত্যেক নারী-পুরুষের পক্ষে শিক্ষা বাধ্যতামূলক করিতে হইবে। দেশের সর্বত্র মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করিয়া শিক্ষা সহজলভ্য করিতে হইবে। উচ্চতর শিক্ষা বিশেষ করিয়া কারিগরি শিক্ষার জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন শিক্ষাকেন্দ্র খুলিতে হইবে এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে সরকারি বৃত্তির সাহায্যে উচ্চতর শিক্ষা উৎসাহিত করতে হবে। মাতৃভাষাকে শিক্ষার বাহন করিতে হইবে।”
১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট গঠনে বঙ্গবন্ধু অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা কর্মসূচির ৯ ও ১০ নং দফায় দলের শিক্ষানীতি স¤পর্কে বলা হয়েছে-
১. “দেশের সর্বত্র প্রাথমিক ও অবৈতনিক বাধ্যতামূলক শিক্ষা প্রবর্তন করা হইবে এবং শিক্ষকদের ন্যায়সঙ্গত বেতন ও ভাতার ব্যবস্থা করা হইবে।”
২. “শিক্ষা ব্যবস্থার আমুল সংস্তার করিয়া শিক্ষাকে বৈজ্ঞানিক উপায়ে কার্যকরী করিয়া বেসরকারি বিদ্যালয়সমুহের বর্তমান ভেদাভেদ উঠাইয়া দিয়া একই পর্যায়ভূক্ত করিয়া সকল বিদ্যালয়সমুহকে সরকারি সাহায্যপূষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হইবে এবং শিক্ষকদের উপযুক্ত বেতন ও ভাতার ব্যবস্থা করা হইবে।”
১৯৫৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর পাকিস্তান গণপরিষদে প্রদত্ত এক ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেন, “আমাদের দেশে ন্যুনতম শিক্ষা লাভেরও সুযোগ নাই। সিংহলে নি¤œ¥ স্তর থেকে উচ্চতর পর্যন্ত প্রত্যেকেই এম.এ ডিগ্রি লাভ পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষালাভের সুযোগ পায়, অথচ আমাদের দেশে এমনকি প্রাথমিক শিক্ষা লাভেরও সুযোগ নাই।”
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগে বঙ্গবন্ধু বেতার ভাষণে শিক্ষা স¤পর্কে তাঁর দর্শন তুলে ধরে বলন, “সুষ্ঠু সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য শিক্ষাখাতে পুঁজি বিনিয়োগের চাইতে উৎকৃষ্ট বিনিয়োগ আর কিছু হইতে পারে না।”
১৯৭২ সালে সংবিধান প্রনয়নের পূর্বে শাসনন্ত্রের বৈশিষ্ট স¤পর্কিত এক আলোচনায় বঙ্গবন্ধু সু¯পষ্টভাবে বলেন, “আমাদের দেশের শিক্ষিত সমাজের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিরা যাতে শিক্ষকতা পেশার প্রতি আকৃষ্ট হন সেই পরিবেশ সৃষ্টির জন্য সব রকম চেষ্টা করা হবে। এজন্য কেবল তাদের বেতন স্কেল বৃদ্ধি ও বৈষয়িক সুবিধা দিলে চলবে না, সঙ্গে সঙ্গে কাজ করার উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি এবং শিক্ষকদের ন্যয্য মর্যাদা এবং সম্মানও দিতে হবে।”
বাহাত্তরের সংবিধানে আলোকে একটি জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন করার উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ২৬ জুলাই ড. কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন গঠন করেন। বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ড. কুদরত-ই-খুদার নেতৃত্বে ১৮ জন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদের সমন্বয়ে ১৯৭২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ড. কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনকালে বঙ্গবন্ধু বলেন, “বর্তমান শিক্ষার নানাবিধ অভাব ও ক্রুটি বিচ্যুতি দুরীকরণ, শিক্ষার মাধ্যমে সুষ্ঠু জাতি গঠনের নির্দেশনা দান এবং দেশকে আধুনিক জ্ঞান ও কর্মশক্তিতে বলীয়ান করার পথ নির্দেশের উদ্দেশেই সরকার এ কমিশন নিয়োগ করেছেন।” কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত এ রিপোর্ট বাস্তবায়নের মাঝপথেই পঁচাত্তরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটে।
প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর হাতে ক্ষমতা চলে যাওয়ায় কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশনের সুপারিশমালা বাস্তবায়িত হয়নি। বঙ্গবন্ধু তাঁর নিজের লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনীর’ ৪৮ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেন “সুজলা সুফলা বাংলাদেশ স¤পদে ভর্তি। এমন উর্বর জমি দুনিয়ার খুব অল্প দেশেই আছে। তবুও এরা গরীব। কারণ, যুগ যুগ ধরে এরা শোষিত হয়েছে নিজের দোষে। নিজকে এরা চেনে না, আর যতদিন চিনবে না এবং বুঝবে না ততদিন এদের মুক্তি আসবে না।” (পৃষ্ঠা-৪৮)
বঙ্গবন্ধু তাঁর এ উক্তির মাধ্যমে একটি সুশিক্ষিত জাতির কথাই বলেছেন। তিনি মানুষকে শিক্ষার আলোকে আলোকিত করার তাগিদ অনুভব করেছেন। বঙ্গবন্ধুর আজীবন লালিত স্বপ্ন ছিল একটি শোষণ ও বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলা। বঙ্গবন্ধুর শিক্ষার প্রতি মমত্ববোধ ফুটে উঠে দেশের সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়কে একযোগে সরকারিকরণের মাধ্যমে। ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৫ সালের জুলাই মাসের মধ্যে ৩৬,১১৫ টি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করা হয়। এর ফলে ১,৫৫,০২৩ জন শিক্ষকের চাকরি সরকারি হয়। এবং ১৯৭৩ সালের জুলাই মাস থেকে তা বাস্তবায়ন করা হয়।
বঙ্গবন্ধুর শিক্ষাদর্শনে শিক্ষার লক্ষ্যঃ
বঙ্গবন্ধু উন্নত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষে শিক্ষাকে একটি অন্যতম হাতিয়ার বলে মনে করতেন। যুগে যুগে বিভিন্ন দার্শনিক বিভিন্ন দর্শনের আলোকে শিক্ষার স্বরূপ উন্মোচনের মাধ্যমে শিক্ষা-চেতনার বিকাশ ঘটিয়েছেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর শিক্ষাতত্ত্ব ও শিক্ষাদর্শন ভাববাদ, প্রয়োগবাদ বা বস্তুবাদের গন্ডিতে আবদ্ধ নয় বরং বঙ্গবন্ধুর শিক্ষাতত্ত্ব মানবতাবাদ বা মানুষের মুক্তির নি®পন্ন ইতিহাস। বিশেষ করে বাঙালি জাতির মুক্তি ও বিশ্বরাষ্ট্রে বাঙালির মাথা উঁচু করে নেতৃত্ব দেওয়ার দর্শন। বাংলার মানুষ ছিল বঙ্গবন্ধুর পাঠশালা। লোকায়ত বাঙালি সমাজের মানবতাবাদী ধ্যান-ধারণা পরিপুষ্ট করেছে তাঁর কর্ম, কথা, আচরণ ও দর্শনকে। শিক্ষার লক্ষ্য ও স্বপ্নকে বঙ্গবন্ধু সন্তান হিসেবে লালন করেছিলেন। তাই ১৯৫২ সালে ভাষার ওপর আঘাত এলে তিনি প্রতিবাদী হয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু বুঝতে পেরেছিলেন, বাংলা ভাষার বিলয়ে মুখ থুবড়ে পড়বে শিক্ষাব্যবস্থা, বোবাপুরীতে পরিণত হবে সমগ্র বাংলা। ব্রিটিশদের পশ্চিমা শিক্ষাতত্ত্ব, পাকিস্তানিদের শিক্ষা কমিশন ষড়যন্ত্র আর প্রচলিত মধ্যযুগীয় শিক্ষাব্যবস্থার বিপরীতে বঙ্গবন্ধু দিয়ে গেছেন বাঙালির মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর এক মৌলিক শিক্ষাদর্শন।
১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলনের লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য সর্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থার উদ্যোগ নিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৭২ সালের সংবিধানের রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি অংশেই শিক্ষার কথা বলা হয়েছে। শিক্ষার ওপর বঙ্গবন্ধু যে অধিক গুরুত্বারোপ করেছেন তার প্রমাণ মেলে বাংলাদেশের প্রথম বাজেটে। সে বাজেটে প্রতিরক্ষা খাতের চেয়ে শিক্ষা খাতে তিন কোটি ৭২ লাখ টাকা বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। উচ্চশিক্ষার প্রসারের জন্য বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনায় ১৯৭৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয় অর্ডিন্যান্স ঘোষণা করা হয়েছিল, যার মূল কথা বিশ্ববিদ্যালয়ে চিন্তার স্বাধীনতা ও মুক্ত-বুদ্ধিচর্চার পরিবেশ সৃষ্টি করা। ১৯৭২ সালে ড. কুদরাত-এ-খুদাকে সভাপতি করে বঙ্গবন্ধু গঠন করেছিলেন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় শিক্ষা কমিশন। কমিশন শিক্ষা খাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ, বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসার, শিক্ষকের মর্যাদা বৃদ্ধি ও গবেষণার ওপর গুরুত্ব দিয়েছিল। ১৯৭৩ সালে শূন্য কোষাগার নিয়েও বঙ্গবন্ধু দেশের সাধারণ মানুষের সন্তানদের শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের জন্য প্রাথমিক শিক্ষাকে জাতীয়করণ করেছিলেন। শিক্ষকদের উদ্দেশে তিনি বলেছেন, আগামী প্রজন্মের ভাগ্য শিক্ষকদের ওপর নির্ভর করে। শিশুদের যথাযথ শিক্ষার ব্যত্যয় ঘটলে কষ্টার্জিত স্বাধীনতা অর্থহীন হবে। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের মাঝে বিনা মূল্যে বই, খাতা, পেনসিল, দুধ, ছাতু, বিস্কুট বিতরণ করা হতো। বঙ্গবন্ধুর চারিত্রিক দৃঢ়তার পেছনে ছিল গভীর অধ্যয়ন, জানা-চেনা-শোনা ও দেখার গভীর অন্তর্দৃষ্টি।
তিনি নিয়মিত পড়াশোনা করতেন। তাঁর ব্যক্তিগত পাঠাগারের উজ্জ্বল সংগ্রহের কথা অনেকেই জানতেন। শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য মূল্যায়ন করতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ‘আমলা নয়, মানুষ সৃষ্টি করুন’। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের আগে দেশবাসীর উদ্দেশে প্রদত্ত ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছেন, ‘সুষ্ঠু সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য শিক্ষা খাতে পুঁজি বিনিয়োগের চেয়ে উৎকৃষ্ট বিনিয়োগ আর কিছু হতে পারে না। …দারিদ্য যাতে উচ্চশিক্ষার জন্য মেধাবী ছাত্রদের অভিশাপ হয়ে না দাঁড়ায় সেদিকে দৃষ্টি রাখতে হবে।’
১৯৭৪ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সাহিত্য সম্মেলনের বক্তৃতায় তিনি বলেছেন, ‘একটি সুষ্ঠু জাতি গঠনে শিল্প, যোগাযোগব্যবস্থা বা অন্য সব ক্ষেত্রে যেমন উন্নয়ন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন চিন্তা ও চেতনার ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করা। আমি সর্বত্রই একটি কথা বলি, সোনার বাংলা গড়তে হলে সোনার মানুষ চাই। সোনার মানুষ আকাশ থেকে পড়বে না, মাটি থেকেও গজাবে না। এই বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষের মধ্য থেকেই তাঁদের সৃষ্টি করতে হবে।’ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের (১৯২০-১৯৭৫) জীবন, কর্ম, চিন্তা, চেতনা, দর্শন ও মানস গঠনে বিভিন্ন শিক্ষকের গুরুত্বপূর্ণ অবদান ও প্রভাব রয়েছে। বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিজীবন চর্চায়ও শিক্ষক, কবি, শিল্পী ও সাহিত্যিকদের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধার বহু দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। চট্টগ্রামের শ্রমিক নেতা জহুর আহমেদের আচরণে শিক্ষক অপমান বোধ করলে বঙ্গবন্ধু নিজে ওই শিক্ষকের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন। অবরুদ্ধ শিক্ষকদের মুক্ত করতে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে অনুষ্ঠিত (বর্তমান গণভবন) মন্ত্রিসভার জরুরি সভা বাদ দিয়ে তিনি ছুটে গিয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিলের সভাকক্ষে। স্বাধীন বাংলাদেশের উন্নয়নের পরিকল্পনায়ও তিনি শিক্ষকদের যুক্ত করেছিলেন। পরিকল্পনা কমিশনে ড. নূরুল ইসলাম, প্রফেসর রেহমান সোবহান, প্রফেসর আনিসুর রহমান, ড. মোশাররফ হোসেনসহ অসংখ্য শিক্ষক, প্রকৌশলী ও পেশাজীবীকে জড়ো করেছিলেন। প্রফেসর কবীর চৌধুরীকে তিনি শিক্ষাসচিব নিযুক্ত করেছিলেন। প্রফেসর মোজাফফর আহমদ চৌধুরী ও ড. এ আর মল্লিককে মন্ত্রিসভায় নিয়েছিলেন। সাহিত্যিক আবুল ফজলকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য করেছিলেন। জয়নুল আবেদিনসহ সব শিল্পী ও শিক্ষাবিদকে তিনি শিক্ষকতুল্য সম্মান করতেন এবং তাঁদের উপদেশ শুনতেন।
একটি জাতি বা রাষ্ট্রের শিক্ষাদর্শ নির্ভর করে সে রাষ্ট্র বা জাতির শাসক বা জনকের নীতি-আদর্শের ওপর। এ কারণে রাষ্ট্রের পথপ্রদর্শক বা জাতির অগ্রনায়ক যত বেশি গুণাবলির অধিকারী হন, সে জাতির শিক্ষাব্যবস্থা তত বেশি উন্নত হয়। আমরা জানি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিয়মিত বই পড়েন। বিশ্বের অন্যতম বুদ্ধিভিত্তিক শাসকের স্বীকৃতিও তিনি পেয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর শিক্ষাদর্শের আলোকে একটি সুখী-সমৃদ্ধ ও সমুন্নত বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘শিক্ষাকে আমি খরচ মনে করি না; আমি মনে এটি একটি বিনিয়োগ, জাতিকে গড়ে তোলার বিনিয়োগ।’ ঐতিহাসিক সমুদ্রজয়ের কারিগর শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনিও উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিত্ব।
দেশীয় শিক্ষাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নত করতে তাঁর বেশ কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন-সংস্তারের পদক্ষেপও দৃষ্টিগ্রাহ্য হচ্ছে। স্বীকার্য যে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর বর্ণাঢ্য জীবনের প্রতিটি স্তরেই রেখে গেছেন কালোত্তীর্ণ মুক্তিদর্শনের পথ। তাই, বঙ্গবন্ধুর শিক্ষাদর্শন নিয়ে অধিক গবেষণা করা হলে এবং তার আলোকে বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করা হলে বাঙালির শিক্ষামুক্তির পথ হবে আরো মসৃণ ও যথাযথ।
বঙ্গবন্ধু ছিলেন শিক্ষা ও শিক্ষক বান্ধবঃ
বঙ্গবন্ধু শিক্ষা অনুরাগী ছিলেন। শিক্ষকদের জন্য ছিল তাঁর অকৃত্রিম ভালোবাসা । আমাদের জাতির পিতা মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের (১৯২০-১৯৭৫) জীবন, কর্ম, চিন্তা, চেতনা, দর্শন ও মানসগঠনে বিভিন্ন শিক্ষকের গুরুত্বপূর্ণ অবদান ও প্রভাব রয়েছে। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী, তাঁর পড়ার সাথি, খেলার সাথি, বন্ধুবান্ধব ও বিভিন্ন সূত্র থেকে তাঁর শিক্ষাজীবন ও শিক্ষকদের স¤পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। এসব ঘটনা ও তথ্য যেমন বাধ্যগত একজন ছাত্র তথা শিক্ষার্থী হিসেবে তাঁর পরিচয় বহন করে, তেমনি একজন ভবিষ্যৎ মহামানবের ইঙ্গিতবাহীও। পরবর্তীকালে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী থাকাকালেও বঙ্গবন্ধু নির্দ্বিধায় শিক্ষকদের কাছে টেনেছেন ভক্তি, শ্রদ্ধা ও আন্তরিকতায়, নানা কুশলাদিও নিয়েছেন। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তিনি লেখাপড়া করেন টুঙ্গিপাড়া গিমাডাঙ্গা এমই স্কুল, গোপালগঞ্জ সীতানাথ একাডেমি, মাদারীপুর ইসলামিয়া হাইস্কুল, গোপালগঞ্জ পাবলিক স্কুল, গোপালগঞ্জ মিশন স্কুল, কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।
বঙ্গবন্ধুর প্রাথমিক শিক্ষাজীবন শুরু হয় পারিবারিক পরিবেশে তাঁর পিতা শেখ লুৎফর রহমান ও মাতা সায়েরা বেগমের তত্ত্বাবধানে। পিতা শেখ লুৎফর রহমান ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা ও সচেতন ব্যক্তি। তিনি আদরের পুত্র খোকার (বঙ্গবন্ধুর পারিবারিক নাম) জন্য বাড়িতে তিনজন শিক্ষক রেখেছিলেন। একজন ইসলাম ধর্ম শিক্ষার জন্য মৌলভি সাহেব, দ্বিতীয়জন সাধারণ শিক্ষার জন্য প-িত সাখাওয়াত উল্লাহ পাটোয়ারী, তৃতীয়জন কাজী আবদুল হামিদ। বঙ্গবন্ধু মৌলভি সাহেবের কাছে
আমপারা আর প-িত সাখাওয়াত উল্লাহর কাছে বাংলা বর্ণমালা ও নামতা পড়তেন এবং কাজী আবদুল হামিদের কাছে পড়তেন কবিতা-গল্প ইত্যাদি। শিক্ষক সাখাওয়াত উল্লাহ পাটোয়ারী স¤পর্কে জানা যায় বঙ্গবন্ধুর কাছের আত্মীয় এবং খেলাধুলা ও পড়ার সাথি শেখ আশরাফুল হক ওরফে আমিন মিয়া (১৯১৪-২০০৯ সূত্রে)। শেখ আশরাফুল হক ছিলেন বঙ্গবন্ধুর চাচা ও মামাও। তাঁরা একই সঙ্গে পড়তেন সাখাওয়াত উল্লাহ পাটোয়ারীর কাছে। বঙ্গবন্ধু শিক্ষক ও মুরব্বিদের খুব ভক্তি–শ্রদ্ধা করতেন। সাখাওয়াত উল্লাহ পাটোয়ারীর বাড়ি ছিল নোয়াখালী। তিনি বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে লজিং থাকতেন। লেখাপড়ার ব্যাপারে তিনি খুবই কঠোর ছিলেন। কিছুদিন পর পাটোয়ারী স্যার অন্যত্র চলে যাওয়ার সময় তাঁর বিছানাপত্রের গাঁটটি নিজের মাথায় করে পাটগাতি পৌঁছে দিয়েছেন মুজিব। শিক্ষকের প্রতি এমনই ভক্তি-শ্রদ্ধা ছিল কিশোর মুজিবের। বঙ্গবন্ধুর ছাত্রজীবনে যে শিক্ষক তাঁর আদর্শ ছিলেন, তাঁর নাম কাজী আবদুল হামিদ। এই শিক্ষক তাঁকে কীভাবে প্রভাবিত করেছিলেন তাঁর প্রসঙ্গ তিনি অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে উল্লেখ করেছেন। বঙ্গবন্ধু লিখেছেন,
‘১৯৩৭ সালে আবার আমি লেখাপড়া শুরু করলাম। এবার আর পুরোনো স্কুলে পড়ব না, কারণ আমার সহপাঠীরা আমাকে পিছনে ফেলে গেছে। আমার আব্বা আমাকে গোপালগঞ্জ মিশন স্তুলে ভর্তি করিয়ে দিলেন। আমার আব্বাও আবার গোপালগঞ্জ ফিরে এলেন। এই সময় আব্বা কাজী আবদুল হামিদ এমএসসি মাস্টার সাহেবকে আমাকে পড়াবার জন্য বাসায় রাখলেন। তাঁর জন্য একটা আলাদা ঘরও করে দিলেন। গোপালগঞ্জের বাড়িটা আমার আব্বাই করেছিলেন। মাস্টার সাহেব গোপালগঞ্জে একটা মুসলিম সেবা সমিতি গঠন করেন। যার দ্বারা গরিব ছেলেদের সাহায্য করতেন। মুষ্টি ভিক্ষার চাল উঠাতেন সকল মুসলমান বাড়ি থেকে। প্রত্যেক রবিবার আমরা থলি নিয়ে বাড়ি বাড়ি থেকে চাল উঠিয়ে আনতাম এবং এই চাল বিক্রি করে তিনি গরিব ছেলেদের বই এবং পরীক্ষার ও অন্যান্য খরচ দিতেন। ঘুরে ঘুরে জাগগিরও ঠিক করে দিতেন। আমাকেই অনেক কাজ করতে হতো তাঁর সঙ্গে। হঠাৎ যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান। তখন আমি এই সেবা সমিতির ভার নেই এবং অনেক দিন পরিচালনা করি। আর একজন মুসলমান মাস্টার সাহেবের কাছে টাকাপয়সা জমা রাখা হতো। তিনি সভাপতি ছিলেন আর আমি ছিলাম স¤পাদক।’
বঙ্গবন্ধুর শিক্ষক-ভক্তির অত্যুজ্জ্বল উদাহরণ রেখেছেন টুঙ্গিপাড়ার গিমাডাঙ্গা জি টি স্কুলের শিক্ষক বেজেন্দ্রনাথ সূত্রধরের ক্ষেত্রে। বঙ্গবন্ধু এই স্কুলে প্রথম শ্রেণি থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছেন ১৯২৭ থেকে ১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত। ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরও প্রাইমারি স্তুলের সেই শিক্ষক বেজেন্দ্রনাথ সূত্রধর ও সহপাঠী সৈয়দ নুরুল হক মানিকের কথা ভোলেননি। বঙ্গবন্ধু বেজেন্দ্রনাথ সূত্রধর ও সহপাঠী সৈয়দ নুরুল হককে ঢাকা আসার জন্য খবর পাঠান। নির্দিষ্ট তারিখে তাঁরা দুজন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করার জন্য গেটে উপস্থিত হয়ে ভেতরে যাওয়ার অনুমতি চান। বঙ্গবন্ধু খবর পেয়ে সব নিয়মকানুন উপেক্ষা করে তাঁর প্রাইমারি স্কুলজীবনের শিক্ষকের কাছে নিজেই ছুটে আসেন এবং স্যারের পায়ে ধরে সালামের পর বুকে জড়িয়ে ধরেন। গেটেই তখন অভাবনীয় দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। অতঃপর বঙ্গবন্ধু তাঁর শৈশবের খেলার সাথি স্কুলজীবনের বন্ধু মানিককেও জড়িয়ে ধরেন। বঙ্গবন্ধু সেই শিক্ষককে নিয়ে যান প্রধানমন্ত্রী, অর্থাৎ তাঁর অফিসকক্ষে। তিনি শিক্ষককে নিয়ে নিজের চেয়ারে বসিয়ে উপস্থিত মন্ত্রী, এমপিদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে গর্বভরে বলেন, আমার শিক্ষক। অতঃপর বঙ্গবন্ধু তাঁর স্কুলজীবনের শিক্ষক ও সহপাঠীর নানা খোঁজখবর নেন। অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু শিক্ষকের হাতে কিছু টাকা দেন তাঁর ঘর তোলার জন্য।
বঙ্গবন্ধুর আরেকজন শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষক ছিলেন গিরিশ বাবু। বঙ্গবন্ধু ১৯৩৭ সালে যখন গোপালগঞ্জ খ্রিষ্টান মিশনারি হাইস্কুলে ভর্তি হন, তখন ওই স্কুলের শিক্ষক ছিলেন গিরিশ বাবু। তিনি ছিলেন রাশভারী ও গম্ভীর এবং সব ছাত্রের প্রিয়। কিশোর ছাত্র মুজিব ছিলেন সত্যবাদী ও অন্যায়ের প্রতিবাদকারী। গিরিশ বাবু ছাত্র মুজিবকে ¯েœহ করতেন সাহসিকতা ও ¯পষ্টবাদিতার জন্য। বঙ্গবন্ধুও শিক্ষক গিরিশ বাবুকে বিশেষভাবে শ্রদ্ধা করতেন।
বঙ্গবন্ধু যখন ১৯৪১ সালে গোপালগঞ্জ মিশন স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেওয়ার প্রস্তুতি নেন, তখন স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন নরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত। ওই সময় একজন মুসলমান ছাত্র অন্যায়ভাবে মারপিটের শিকার হয়। বঙ্গবন্ধু তখন স্কুুলের শিক্ষক নরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্তের কাছে বিষয়টির মীমাংসা চান। শিক্ষক নরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত অন্যদের সহায়তা নিয়ে বিষয়টি সুষ্ঠুভাবে মিটমাট করেন। বঙ্গবন্ধু ওই শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে তাঁর সিদ্ধান্ত মেনে নেন। ওই স্কুলে আর কখনো এ ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। ওই স্তুলে বঙ্গবন্ধুর দুজন শিক্ষকের নাম পাওয়া যায় তাঁর আত্মজীবনীতে। তিনি লিখেছেন, ‘১৯৪১ সালে আমি ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেব। পরীক্ষায় পাস আমি নিশ্চয়ই করব, সন্দেহ ছিল না। রসরঞ্জন বাবু ইংরেজির শিক্ষক, আমাকে ইংরেজি পড়াতেন। আর মনোরঞ্জন বাবু অঙ্কের শিক্ষক, আমাকে অঙ্ক পড়াতেন।’ তাঁদের মধ্যে রসরঞ্জন সেনগুপ্ত খেলার প্রতিযোগিতা বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ওই সময় বঙ্গবন্ধু ছিলেন গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলের ফুটবল টিমের ক্যাপ্টেন। আর অন্যদিকে বঙ্গবন্ধুর পিতা শেখ লুৎফর রহমান ছিলেন অফিসার্স ক্লাবের সেক্রেটারি। ১৯৪০ সাল থেকেই পিতা ও পুত্রের টিমের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলে আসছিল। এই প্রতিযোগিতায় বঙ্গবন্ধুর স্কুল টিম প্রায় সব খেলাতেই জয়ী হতো। এই পরিস্থিতিতে দুই পক্ষের টিমের মধ্যে সমঝোতা হয়। এই সমঝোতায় প্রধান ভূমিকা পালন করেন শিক্ষক রসরঞ্জন সেনগুপ্ত।
বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনীতে কলকাতার ইসলামিয়া কলেজের শিক্ষাজীবন, শিক্ষক এবং সমকালীন রাজনীতি ও অন্যান্য ঘটনা স¤পর্কে অনেক মূল্যবান ও দুর্লভ প্রামাণ্য তথ্য রয়েছে। ইসলামিয়া কলেজ ছিল ছাত্র আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র। ¯পষ্টবাদিতা, সাহস, ন্যায্যতা, নিষ্ঠা, মানবিকতা ও সাংগঠনিক নেতৃত্বের কারণে অতি অল্প সময়ের মধ্যে বঙ্গবন্ধু ইসলামিয়া কলেজে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। ১৯৪৩ সালে মন্বন্তরের সময় বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের সেবা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। ওই সময় দুর্ভিক্ষের অবস্থা, বেকার হোস্টেলের ছাত্রদের সহায়তা এবং কলেজের শিক্ষক সাইদুর রহমান, আই এইচ জুবেরী, নারায়ণ বাবুসহ অধ্যাপকদের সহমর্মিতা স¤পর্কে জানা যায় বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনীতে। তিনি লিখেছেন, ‘এই সময় শহীদ সাহেব লঙ্গরখানা খোলার হুকুম দিলেন। আমিও লেখাপড়া ছেড়ে দুর্ভিক্ষপীড়িতদের সেবায় ঝাঁপিয়ে পড়লাম। অনেকগুলি লঙ্গরখানা খুললাম। দিনে একবার করে খাবার দিতাম। মুসলিম লীগ অফিসে, কলকাতা মাদ্রাসা এবং আরও অনেক জায়গায় লঙ্গরখানা খুললাম। দিনভর কাজ করতাম, আর রাতে কোনো দিন বেকার হোস্টেলে ফিরে আসতাম, কোনো দিন লীগ অফিসের টেবিলে শুয়ে থাকতাম। আমার আরও কয়েকজন সহকর্মী ছিলেন। যেমন পিরোজপুরের নুরুদ্দিন আহমেদ—যিনি পরে পূর্ব বাংলার এমএলএ হন। নিঃস্বার্থ কর্মী ছিলেন যদিও তিনি আনোয়ার হোসেন সাহেবের দলে ছিলেন, আমার সঙ্গে এদের গোলমাল ছিল, তবুও আমার ওকে ভালো লাগত। বেকার হোস্টেলের সুপারিনটেনডেন্ট ছিলেন প্রফেসর সাইদুর রহমান সাহেব (বহু পরে ঢাকার জগন্নাথ কলেজের প্রিন্সিপাল হন) আমাকে অত্যন্ত ¯েœহ করতেন। হোস্টেল রাজনীতি বা ইলেকশনে আমার যোগদান করার সময় ছিল না। তবে তিনি আমার সঙ্গে পরামর্শ করতেন। প্রিন্সিপাল ছিলেন ড. আই এইচ জুবেরী। তিনিও আমাকে খুবই ¯েœহ করতেন।’ তিনি আরও লিখেছেন, ‘হোস্টেল সুপারিনটেনডেন্ট সাইদুর রহমান সাহেব জানতেন, আমার অনেক অতিথি আসত। বিভিন্ন জেলার ছাত্রনেতারা আসলে কোথায় রাখব, একজন না একজন ছাত্র আমার সিটে থাকতই। কারণ, সিট না পাওয়া পর্যন্ত আমার রুমই তাদের জন্য ফ্রি রুম।’ একদিন বললাম, “স্যার, কোনো ছাত্র রোগাগ্রস্ত হলে যে কামরায় থাকে, সেই কামরাটা আমাকে দিয়ে দেন। সেটা অনেক বড় কামরা দশ-পনেরো জন লোক থাকতে পারে।” বড় কামরাটায় একটা বিজলি পাখাও ছিল। নিজের কামরাটা তো থাকলই। তিনি বললেন, “ঠিক আছে, দখল করে নাও। কোনো ছাত্র যেন নালিশ না করে।” বললাম, “কেউই কিছু বলবে না। দু-একজন আমার বিরুদ্ধে থাকলেও সাহস পাবে না।”
ইসলামিয়া কলেজের অধ্যক্ষ ড. জুবেরীও বঙ্গবন্ধুকে খুব ভালোবাসতেন। মন্বন্তরের সময় অতিরিক্ত পরিশ্রমের কারণে বঙ্গবন্ধু অসুস্থ হলে অধ্যক্ষ মাঝেমধ্যে খবর নিতেন। বিএ পরীক্ষা দেওয়ার সময় অধ্যক্ষ বঙ্গবন্ধুকে সহায়তা করেছিলেন, সে প্রসঙ্গে জানা যায় তাঁর আত্মজীবনী থেকে। পরবর্তী জীবনেও শিক্ষকদের প্রতি বঙ্গবন্ধুর অগাধ শ্রদ্ধা ও ভক্তি অটুট ছিল। লেখক, গবেষক, চিন্তাবিদ সৈয়দ আবুল মকসুদ জানিয়েছেন, ‘স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকার সময়ও অধ্যাপক সাইদুর রহমানের পায়ে হাত দিয়ে তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে দেখেছি।’
উপসঙ্গহারঃ
বাঙ্গালি এক অতি পরম সৌভাগ্যবান জাতি । তাদের কিছু কীর্তি ও অর্জন আছে যা বিশ্বে অনেকের নেই । মাতৃভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের সাফল্য দুনিয়ার বুকে কটা জাতির আছে? এরচে বড় কথা আমাদের জাতির পিতা শেখ মুজিবের মত এত বড় মাপের নেতা পৃথিবীর কোন দেশের বা জাতির আছে ?
বঙ্গবন্ধুর একান্ত বিশেষত্ব এই যে, তিনি বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে দীর্ঘ সংগ্রামের পথ পরিক্রমায় পরিপক্ষতা অর্জন করে তবেই আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মহান মুক্তিযুদ্ধে সফল নেতৃত্ব দিতে পেরেছিলেন। পাকিস্তান আমলে তিনি যুক্তফ্রন্ট সরকারে হক মন্ত্রিসভার একজন প্রভাবশালী মন্ত্রি ছিলেন । তখন তার কী-ই বা আর বয়স? মাত্র চৌত্রিশ বছর । বঙ্গবন্ধুর মত দ্বিতীয় আরেক ক্যারিশমেটিক নেতা বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে খুঁজে বের করা কঠিন । তার এক সম্মোহনী শক্তি এবং অনন্য বাগ্মীতা তাকে অন্যদের চেয়ে পৃথক করে রেখেছে । ১৯৭১ সনের সাত মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণটি আমাদের স্বাধীনতা অর্জনকে ত্বরান্বিত করার জন্য যথেষ্ট হয়ে উঠেছিল । এই একটিমাত্র ভাষণ বাঙ্গালি জাতিকে স্বাধীনতা অর্জনের জন্য ঘর ছেড়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে পাগল করে তুলে। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব এবং ব্যক্তিত্বের বিশালতা প্রসঙ্গে কিউবার সাবেক প্রেসিডেন্ট ও মহান বিপ্লবী নেতা প্রয়াত ফিদেল ক্যাস্ত্রো বলেন, ‘ও যধাব হড়ঃ ংববহ ঃযব ঐরসধষধুং.ইঁঃ ও যধাব ংববহ ঝযবরশয গঁলরন. ওহ ঢ়বৎংড়হধষরঃু ্ রহ পড়ঁৎধমব, ঃযরং সধহ রং ঃযব ঐরসধষধুং. ও যধাব ঃযঁং যধফ ঃযব বীঢ়বৎরবহপব ড়ভ রিঃহবংংরহম ঃযব ঐরসধষধুং.’ (আমি হিমালয় দেখিনি, তবে শেখ মুজিবকে দেখেছি । ব্যক্তিত্ব ও সাহসে এই মানুষটি হিমালয়ের সমান । এভাবে আমি হিমালয় দেখার অভিজ্ঞতাই লাভ করলাম ।)
ফিদেল ক্যাস্ত্রোর মত বিশ্ব মাপের নেতার বিশ্লেষনে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক বিশালতা সমসাময়িক বিশ্ব নেতাদের এভাবেই ছাড়িয়ে যায় । আসলে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সাফল্যের পেছনে উপমহাদেশের কজন বরেণ্য রাজনীতিবিদের অবদান কোনমতে কম নয় । এরা হলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দি, মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, শেরে বাংলা একে ফজলুল হক , নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু প্রমুখ । তারা শেখ মুজিবের রাজনৈতিক গুরু ও সহকর্মি ছিলেন । তাদের কাছে রাজনীতির দীক্ষা নিয়ে মুজিব বহুদুর এগিয়ে গেছেন । আওয়ামী মুসলিম লীগের তৎকালীন সভাপতি মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী যখন তার দলের সেক্রেটারী শেখ মুজিব স¤পর্কে বলেন , ‘মজিবরের মত সেক্রেটারী আমি আর জীবনে পামু না ‘- তখন আমরা টুঙ্গিপাড়ার শেখ মুজিবের মধ্যে জাতির দুর্দিনের কান্ডারী শেখ মুজিবকে আবিস্তার করি । বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোকপাত করা সাধারণের পক্ষে কঠিন । তাকে নিয়ে কত গুণীজনে লিখেছেন । গবেষণা ও বিশ্লেষণ করেছেন দেশ বিদেশের কত খ্যাতিমান ব্যক্তি ।
তিনি নিজে ও তার জীবনের বিভিন্ন দিকের ওপর আলোকপাত করেছেন তার আত্মজীবনীতে । সেটি অসমাপ্ত আত্মজীবনী নামে তার মৃত্যুর বহু পরে প্রকাশিত হয়েছে ।
১৯৭২ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের জেল থেকে মুক্তি পেয়ে যুদ্ধ-বিধ্বস্ত বাংলাদেশে ফিরে আসেন শেখ মুজিব । দেশে ফিরে তিনি শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি সর্বাগ্রে নজর দেন । প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাবার জন্য কুদরাত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন গঠন করেন । এ কমিশনের রিপোর্ট আদ্যেপান্ত পাঠ করে যে কেউ বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা দর্শনটি সহজে অনুধাবন করতে পারে । সত্যিকারের একজন দেশপ্রেমিক শিক্ষাবিদের ন্যায় বঙ্গবন্ধুর চিন্তা-চেতনার প্রতিফলন তাতে ঘটেছে। তিনি বাঙ্গালী জাতিকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে শিক্ষাকে একটি হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করতেন । দক্ষিণ আফ্রিকার অবিসংবাদিত বর্ণবাদ বিরোধী নেতা ও সাবেক প্রেসিডেন্ট নেলসন ম্যান্ডেলা শিক্ষাকে যেভাবে মনে করেন -‘ঊফঁপধঃরড়হ রং ঃযব সড়ংঃ ঢ়ড়বিৎভঁষ বিধঢ়ড়হ ঃযধঃ বি পধহ ঁংব ঃড় পযধহমব ঃযব ড়িৎষফ’.
আমাদের জাতির জনক শেখ মুজিব প্রাথমিক শিক্ষাকে অবৈতনিক করেন । সবার জন্য এ স্তরের শিক্ষা বাধ্যতামুলক ও সার্বজনীন করে দেন । শিক্ষকদের জীবন-মান ও মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য তাদের চাকুরী জাতীয়করণ করেন । পরবর্তী পর্যায়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা স্তর নিয়ে ও তার সে ভাবনাই ছিল ।দুর্ভাগ্য আমাদের । বঙ্গবন্ধুর সে স্বপ্ন আর এগুতে পারেনি । তার সে স্বপ্নগুলো ৭৫ র ১৫ আগষ্ট স্তব্ধ হয়ে যায় । সেখানেই আটকে পড়ে বাংলাদেশ । তবে তাঁর যোগ্য কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা তাঁর পিতার মতই দেশকে একটি উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করার মিশনে ব্যস্ত।
@সত্ত্বাধিকার সংরক্ষিত

লেখকঃ মো হাবিবুর রহমান
সহাকারী অধ্যাপক ও
বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর
ঢাকা, বাংলাদেশ


Logo

Website Design & Developed By MD Fahim Haque - Web Solution