• বিকাল ৪:৪২ মিনিট বুধবার
  • ১৪ই ফাল্গুন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
  • ঋতু : বসন্তকাল
  • ২৬শে ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ইং
এই মাত্র পাওয়া খবর :
সুবর্ণ জয়ন্তী উপলক্ষে কাল সোনারগাঁও সরকারি কলেজে বর্ণাঢ্য র‌্যালি সোনারগাঁয়ের ইউপি সদস্য সিদ্দিরগঞ্জে গ্রেপ্তার আব্দুল আলী,আমির, আতাউর, সানোয়ার, সজিবের নেতৃত্বে কর্মী সভায় যোগদান পৌর যুবদল নেতা সোহেল, মন্টু, আবু সায়ীদ, জসিমের নেতৃত্বে নেতাকর্মীদের কর্মী সভায় যোগদান সোনারগাঁয়ে যুবদলের বিভাগীয় কর্মী সভা অনুষ্ঠিত আশরাফ ভূঁইয়া, আশরাফ প্রধান ও আমিরের নেতৃত্বে কয়েকশত নেতাকর্মী নিয়ে বিভাগীয় কর্মী সভায় যোগদান সোনারগাঁয়ে রাবার ড্যাম অকেজো, অনাবাদি হয়ে পড়ার আশংকা ২ হাজার হেক্টর কৃষি জমি সোনারগাঁয়ে নদী দখল করার অভিযোগে মর্ডান গ্রুপের সব কার্যক্রম বন্ধ করল প্রশাসন সোনারগাঁয়ে রিক্সা মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি সমর আলী মিয়ার ইন্তেকাল শবে মেরাজ আগামী ২২ মার্চ শুভেচ্ছা জানাতে আসা পিরোজপুরবাসীর সাথে উঠান বৈঠক ইঞ্জিনিয়ার মাসুমের আমি দোয়া করি খন্দকার জাফর সু-শিক্ষায় আরো উচ্চ শিক্ষিত হওক.. আজহারুল ইসলাম মান্নান মসজিদে ঢুকে পেটায় ইয়ানবী ও তার বাহিনী, পুলিশ বলেছে ছোটখাটো ঘটনা সোনারগাঁও বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন স্টল বরাদ্দে শঙ্কা কাটেনি দরিদ্র ৩৫ কারুশিল্পীর সোনারগাঁয়ে স্বর্ণের দোকানে লুট জুয়েল বাঁচতে চায় সোনারগাঁয়ে জমি সংক্রান্ত বিরোধে নারী পিটিয়ে আহত সোনারগাঁয়ে ঘুড়ি খেলাকে কেন্দ্র প্রতিপক্ষের হামলায় আহত ১০ শেষ হলো তিনদিন ব্যাপী সোনারগাঁও জাদুঘরের জামদানী মেলা শিশুদের জীবন গড়তে লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধুলার ব্যবস্থা করতে হবে..ইঞ্জি: মাসুম

অর্ধ সত্য

নিউজ সোনারগাঁ২৪ডটকম: মনোরঞ্জন লাহিড়ীর যত চিন্তা তার একমাত্র ছেলে অনিক লাহিড়ীকে নিয়ে। একমাত্র মেয়ে অনামিকার বিয়ে দিয়েছেন প্রায় তিন বছর হয়ে গেছে। গত সপ্তাহে অনামিকার কোলে তার প্রথম নাতি জন্মেছে। সারা বাড়িতে আনন্দের বন্যা বইছে এখন। প্রথম সন্তান প্রসব করছে বলে মেয়ে এখন বাপের বাড়িতেই আছে। ছেলে হবার তিন দিন আগে থেকেই জামাই দিল্লি থেকে এসে শ্বশুরবাড়িতে উঠেছে। মনোরঞ্জন বাবুর পুরো বাড়ি এখন জমজমাট। তার উপর বংশের প্রথম নাতি হয়েছে। যদিও জামাই আরও চারদিন থেকে ফিরে গেছে দিল্লিতে, কিন্তু মেয়ে নাতি নিয়ে মনোরঞ্জন বাবু এখন দিব্বি ব্যাবসা পত্তর ছেড়ে ঘরে বসে মজা লুটছেন। কিন্তু তথাপি মনের গহিনে ছেলেটার চিন্তা ওকে সবসময় কুঁড়ে কুঁড়ে খায়। অনিকের যে ক্যান্সার ধরা পড়েছে।

অনিকের বয়স এখন তিরিশ চলছে। মনোরঞ্জন বাবুর এতো বড় ট্রান্সপোর্টের ব্যাবসার একমাত্র উত্তরসূরি। এখন কলাকাতার রাস্তায় ওঁর চারখানা রুটের বাস ও পাঁচখানা ট্যাক্সি চড়ে বেড়ায়। তা ছাড়াও বিভিন্ন সরকারী অফিসে মনোরঞ্জন বাবুর বেশ কয়েকটা প্রাইভেট কার মাসিক ভাড়ায় দেওয়া আছে। মনোরঞ্জনের ছোটবেলার বন্ধু সমরেশ বর্তমান সরকারের একজন মন্ত্রী মানুষ। মনোরঞ্জনের ব্যবসা ফুলে ফেপে ওঠার সেটাও একটা কারন তো বটেই। তবে উনি নিজেও ভীষণ করিতকর্মা মানুষ। আর সঙ্গে অনিকের মত শিক্ষিত বুদ্ধিমান ছেলে পাশে থাকায় ওর ব্যাবসা দেখা শুনা করবার জন্য বেশি ভাবতে হয়না। অনিক এম কম ও এম বি এ পাশ করে এখন পুরোপুরি বাবার সাথে ব্যবাসায় জুড়ে গেছে।

কিন্তু অসুস্থ অনিকের সমস্ত পরীক্ষা নিরিক্ষা এবং সর্বোপরি ওর বায়াপ্সি করে আজই পারিবারিক ডাক্তার প্রদীপ্ত সেন জানিয়েছেন অনিকের কান্সারের ফার্স্ট স্টেজ ধরা পড়েছে। উনি অনেক ওষুধ বিসুধ লিখে দিয়েছেন এবং ওকে নিয়মিত চেক আপ করে খাওয়া দাওয়া সব রেস্ট্রিক্সন করতে বলে দিয়েছেন। যদিও অনিকের চেহারা দেখে বোঝার কোন উপায় নেই যে ওর লাং ক্যান্সার ধরা পড়েছে। অনিক লম্বায় প্রায় ছ’ফিট। ওর গায়ের রং হাল্কা তামাটে, মাথা ভর্তি ঘন কালো চুল, সরু করে কাঁটা গোঁফে স্যুট টাই পড়লে ওকে ভীষণ স্মার্ট দেখায়। যদিও সাধারানত কোন পার্টি বা সরকারী অফিসারের সাথে দেখা করতে গেলে তবেই অনিক স্যুট টাই পড়ে বেড় হয়।

মনোরঞ্জন বাবুর পরিকল্পনা ছিল মেয়ের বিয়ে দেবার দুই আড়াই বছর বাদেই ছেলেকে বিয়ে দিয়ে দেবেন। কিন্তু অনামিকার সন্তান প্রসবের কয়েকদিন পর থেকেই অনিকের শরীর হটাত খারাপ হতে থাকে। মাঝে মাঝেই কাশতে কাশতে গলা দিয়ে রক্ত বেড় হতে থাকে। অনিক একজন চেন স্মোকার। তার উপর ওর সবচেয়ে খারাপ অভ্যাস হল ওর তালতলার অফিসে দোতলায় বদ্ধ এয়ার কন্ডিশন চেম্বারের ভিতরে বসে বাবু একের পড় এক সিগারেট টেনে চলেন। অনিকের মদ বা মেয়েদের প্রতি কোন আসক্তি নেই। ওর একমাত্র বদ নেশা হল দিনে কমপক্ষে দুই প্যাকেট সিগারেট ধ্বংস করা। তারই ফলস্বরূপ আজ ধরা পড়ল ওর লাং ক্যান্সার হয়েছে। বেচারা মনোরঞ্জন বাবুর ছেলের বিয়ে দেবার ইচ্ছায় নামল এক বিরাট বাঁধা।

মনোরঞ্জন বাবুর আরেকজন শক্ত খুঁটি হলেন তার স্ত্রী মহুয়া লাহিড়ী। উত্তর কলকাতার খাস বনেদি এদেশি পরিবারে বাবা মায়ের আদরে বড় হয়ে ওঠা মহুয়া দেবী নিজে পড়াশুনায় মাত্র স্কুল ফাইনাল পাশ করা হলেও ছেলেমেয়ের শিক্ষার দিকে তার ছিল কড়া নজর। অনামিকা ইতিহাসে এম এ পাশ করার পড় ওর বিয়ে হয়েছে। আর অনিক এম কম করে তারপর আবার এম বি এ কোর্সটাও করে নিয়েছে। এসবের পিছনেই ওদের মায়ের  অবদান ও কড়া শাসন ছিল উল্লেখযোগ্য। মনোরঞ্জন বাবু যখন তার ব্যাবসা বৃদ্ধিতে ব্যস্ত তখন তাকে শুধু বুদ্ধি পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করা না, ছেলে মেয়েদের পড়াশুনা ও ঘর সংসার সামলানো ছিল মহুয়া লাহিড়ীর ভীষণ প্রিয় কাজ। কিন্তু ছেলে যে এইভাবে শরীরের বারোটা বাজিয়ে সারাদিন অফিসে কাজের ফাঁকে সমানে সিগারেট ফুকে চলেছে সেই কথাটা মহুয়া দেবীর জানা ছিলনা। যখন উনি সেটা জানলেন তখন অনেক দেড়ি হয়ে গেছে। কিন্তু কান্সারের মত এতো ভয়ানক রোগের কথা জেনেও কিন্তু মহুয়া লাহিড়ী ভেঙ্গে পড়লেন না।

ডাক্তার সেন ফাইনাল রিপোর্ট দেখে মনোরঞ্জন বাবুকে জানালেন ওর ছেলের ক্যান্সার ধরা পড়বার কথা। রাতেই ঘুমবার আগে স্ত্রীকে ফিস ফিস করে সব জানালেন মনোরঞ্জন বাবু। অনিক তখনও জানেনা যে ওর বায়াপ্সি রিপোর্টে ক্যান্সার ধরা পড়েছে। অনিককে ডাক্তার সেনও কিছুই জানান নি। মনোরঞ্জন বাবুর বিকাল থেকেই মন খারাপ। ছেলের এতো সাংঘাতিক রিপোর্ট পাবেন উনি কয়েকদিন আগেও সেটা কল্পনা করতে পাড়েন নি। ঘরের দরজা বন্ধ করে বিছানায় স্ত্রীকে পাশে বসতে বলে বললেন,’অনিকের বায়াপ্সি রিপোর্ট আজ পেয়েছি মহুয়া। ও অবশ্য কিছুই জানে না এখনো। ভাবছি কি করব এখন, ওকে জানাব নাকি জানাব না ?’

মহুয়া দেবী বড় লাইট নিভিয়ে ডিম লাইট জ্বালিয়ে স্বামীর পাশে এসে বসে একইরকম ভাবে ফিসফিস করে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কি রিপোর্ট গো ? কিছু খারাপ রোগ নাকি, কি হয়েছে বুড়োর ?’ মহুয়া দেবী আদর করে  মেয়েকে অণু এবং ছেলেকে বুড়ো বলে ডেকে থাকেন। স্বামী বাড়ি ফেরার পড় থেকেই গম্ভীর সেটা উনি আগেই খেয়াল করেছেন। কিন্তু বাড়িতে ছেলে মেয়ে সবাই রয়েছে। তাই কিছু জিজ্ঞাসা করেন নি। জানেন যে স্বামী তার যত আলোচনা রোজ শোবার সময় করবেন এবং মহুয়া দেবীর পরামর্শ নেবেন। সারাদিনে এই একটা সময় উনি ওঁদের স্বামী স্ত্রীর মধ্যে তৃতীয় আর কাউকে ঢুকতে দেন না। এই সময়টা শুধু ওঁদের দুজনের জন্যই নির্দিষ্ট যেন।

অনিকের লাং ক্যান্সার ধরা পড়েছে অত্যাধিক সিগারেট খাওয়া এবং মুলত বদ্ধ এ সি কেবিনে বসে স্মোক করার জন্য শুনে দুঃখের চেয়েও ছেলের উপর খুব রাগ হচ্ছিল মহুয়া দেবীর। চাঁপা গলায় স্বামীকে চোখ পাকিয়ে ধমকে উঠে বললেন, ‘তা তুমি এতদিন কি করছিলে ? বুড়ো যে এভাবে শরীরের বারোটা বাজাচ্ছে সেটা তোমার জানা ছিল না ? তুমি তো অফিসের নিচের তলাতেই বসো, উপরে বসে ছেলে যে সমানে সিগারেট ফুকে চলেছে তুমি সেটা এতো দিনেও জানতে পারো নি ?’

মনোরঞ্জন বাবু স্ত্রীর এই ওঁকেই দোষারোপ করা দেখে মনঃক্ষুণ্ণ হলেন ঠিকই কিন্তু তাও বিশেষ কিছু বলতেও পাড়লেন না। সত্যিই তো, ওঁর ব্যাপারটা আরও সিরিয়াসলি নেওয়া উচিত ছিল। ওঁদের অফিসের পুরানো চাকর বিশু মনোরঞ্জন বাবুকে দুই একবার বলেছিল যে অনিকের ভীষণ সিগারেটের নেশা হয়েছে। কিন্তু ছেলে এই বয়সে মদ খায় না, কোন মেয়ে মানুষের সাথে বন্ধুত্ব করেনি বা মেয়েদের সাথে ফুর্তি করে পয়সাও ওড়ায় না, এটাই ছিল মনোরঞ্জন বাবুর মনের সান্ত্বনা। উনি ভাবতেন তা একটু সিগারেট খেলে এমন কি ক্ষতি।মনোরঞ্জন বাবু ভাবতেই পাড়েন নি যে সেই ক্ষতির পরিমানটা হবে এতো বড় যে ওঁদের চিন্তা ভাবনার বাইরে চলে যাবে।

উনি ফিস ফিস করে বললেন,’এই বয়সে ছেলেরা একটু আধটু সিগারেট খায়, ওতো আর মদ খায় বা মেয়েছেলে নিয়ে ফুর্তি করে না। একটা কিছু নিয়ে তো থাকবে নাকি ? আমি সেটা ভাবছি না, আমি ভাবছি বুড়ো কে যে বিয়ে দেব ভাবছিলাম, তার কি হবে ? এখন এই খবর জানলে কি বুড়ো আর বিয়ে করতে চাইবে ? আমার তো মনে হয় না। ওদিকে ছেলের এই ক্যান্সার রোগ আছে জানলে কোন মেয়ের বাবা কি আর মেয়ে দেবেন ভেবেছ ?’

মহুয়া দেবী এবার একটু চুপ করে বসে রইলেন। অনিকের লাং ক্যান্সার হয়েছে শুনেই ওঁর চোখে জল চলে  এসেছিল। আঁচল দিয়ে চোখ মুখতে মুছতে বললেন,’তুমি বুড়োটাকে এখন কিচ্ছু বলতে যেওনা। পরে ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে একটা ভুজুং ভাজুং কিছু বুঝিয়ে দিয়ে ওর ওষুধ বিসুধ গুলি চালিয়ে যেতে বল ওকে। আচ্ছা, ডাক্তার সেন কি বললেন, এটা কি খুব সিরিয়াস জায়গায় চলে গেছে না কি বুড়োর কিওর হবার চান্স আছে ? আর ক’বছর লাগতে পারে ওর সুস্থ হতে কিছু বললেন উনি ?’

মনোরঞ্জন বাবু স্ত্রীর কাঁধে হাত রেখে ধরা গলায় বললেন,’সবই আমাদের ভাগ্য বুঝলে না। এই রোগে একদমই যে লোকে ভাল হয়না তা নয়, তবে খুব কম পারসেন্টেজ সেটা। আর অনিকের রোগের এখন মাত্র ফার্স্ট স্টেজ ধরা পড়েছে।এই মুহূর্ত থেকে সাবধান হলে ও চিকিৎসা চালিয়ে যেতে পারলে ধীরে ধীরে ও যে ভাল হয়ে উঠবে না তা তো নয়। ঠাকুরের কৃপা থাকলে ভাল হয়েও যেতে পারে। সেটা কত বছরে সুস্থ হবে বা আর কত বছর ছেলেটা বেঁচে থাকবে সে ব্যাপারে উনি কোন কিছু শিওর করে বলেন নি। শুধু বলেছেন এখন থেকে অনিককে কিন্তু খুব সাবধান হতে হবে আর আমাদেরও ওকে চোখে চোখে রাখতে হবে।’

মহুয়া দেবী যেন কিছুটা আস্বস্ত হলেন এবার। স্বামীর হাতটা নিজের কোলে নিয়ে বললেন,’অনিকের বিয়ে কিন্তু আমি দেবই। তুমি ওর স্বাস্থের দিকটা কড়া ভাবে নজরদারি করতে থাকো, আমি এদিকে বড়দিকে বলছি ওঁদের জানাশুনা কোন ভাল পাত্রীর খোঁজ করতে। একমাসের ভিতর একটা ভাল দেখে মেয়ের সাথে আমরা বুড়োকে বিয়ে দিয়ে দেব। কেউ কিছু জানতে পাড়বে না। তুমি এসব আমার উপর ছেড়ে দাও গো। আমি সব মানেজ করে নেব। অণুটার একটা সন্তান হয়েছে, এবার আমাদের ছেলের ঘরেও একটা বাচ্চা চাই।’ কথাটা বলে স্বামীর দিকে তাকিয়ে একটা অদ্ভুত হাসি হাসলেন মহুয়া দেবী। মনোরঞ্জন বাবু এই হাসির মানে বোঝেন। ভিতরে ভিতরে চমকে উঠলেন তিনি। কিন্তু স্ত্রীকে বারণ করার মত সাহস ওঁর কোনদিনই ছিলনা, আজও নেই।

ঠিক হল আগামী জানুয়ারিতেই অনিকের বিয়ে দেওয়া হবে।তবে মেয়ের বাড়িতে বা নিজেদের ঘরের বা বাইরের কোন আত্মীয় স্বজনকে অনিকের এই কঠিন অসুখের কথা কিছুই জানানো হবে না। এমনিতেও ওঁদের ছেলের চেহারা দেখে কিছুই বুঝবার উপায় নেই। এতো পয়সাওয়ালা পরিবারের একমাত্র ছেলে , শিক্ষিত, দেখতে শুনতে ভাল, সি আই টি রোডের উপর নিজেদের এতো বড় দোতলা বাড়ি, এতো বড় ট্রান্সপোর্ট কোম্পানির ব্যবসা। যে কোন মেয়ের বাবা এক কথায় বিয়ে দিতে রাজি হয়ে যাবেন। শুধু অনিককে যে ভাবেই হোক সুস্থ রাখতে হবে। মেয়ে দেখার দায়িত্ব নিলেন মহুয়া দেবী আর ছেলেকে সুস্থ রাখার দায়িত্ব বাবার কাঁধে থাকবে।

মহুয়া দেবীর বড়দির শ্বশুর বাড়ি খড়দা শ্যামের মন্দিরের কাছে। খড়দার গঙ্গা তীরবর্তী এই অঞ্চলে প্রধানত এদেশি মানে ঘটিদের বাস। মনোরঞ্জন বাবু বা তার শ্বশুরবাড়ির সবাই এদেশি। সুতরাং মহুয়া দেবীর বড়দি কয়েকটা মেয়ের খোঁজ দিলেন যারা সবাই এদেশি। কিন্তু তাদের কারো পরিবারের সম্পর্কে জেনে বা কারো ফটো দেখে একজনকেও পছন্দ হচ্ছিল না ওঁর। শেষে একদিন সন্ধ্যায় বড়দি ফোন করে একটা পূর্ব বঙ্গীয় মেয়ের খোঁজ দিলেন। ছোট বোনকে ফোনে বললেন, ‘শোন, এই মেয়েটার বাবা মা পূর্ব বঙ্গীয়, ঢাকার লোক। কিন্তু মেয়ে বা তার বড় দুই ভাই সবার জন্ম এদেশে। খুব সুন্দর দেখতে মেয়েটা। চলবে তো বল।’

মনোরঞ্জন বাবু তখন বাড়িতেই ছিলেন। স্ত্রীকে ইশারায় জিজ্ঞাসা করলেন দিদি কি বলছেন ? মহুয়া দেবী দিদিকে বললেন,’এক মিনিট ধর দিদি…,’ বলেই সেল ফোনে হাত চাপা দিয়ে ফিসফিস করে স্বামীকে বললেন,’একটা বাঙাল ফ্যামিলির মেয়ে আছে বলছে, খুব নাকি সুন্দর দেখতে…কি বলব তাড়াতাড়ি বল…।’

মনোরঞ্জন বাবু নিজে ঘটি হলেও ওর অফিসে বা ড্রাইভারদের মধ্যে অনেকেই পূর্ব বঙ্গের লোক আছে। সুতরাং ওঁর মধ্যে তেমন কোন অচ্ছ্যুত ভাব নেই। উনি ফিস ফিস করে বলে দিলেন,’চলবে বলে দাও। তবে আগে ফটো হোয়াটস এপ করতে বল। দেখি না কেমন।’ স্বামীর কথায় ভরসা পেয়ে মহুয়া দেবী দিদিকে বললেন,’তুমি এক কাজ করো। মেয়েটার ফটো হোয়াটস এপ করো আর ওর ডিটেইল লিখে পাঠাও। দেখছি কি করা যায়।’

সেই রাত্রেই শুতে যাবার আগে মহুয়া দেবী খড়দা থেকে দিদির হোয়াটস এপ ম্যাসেজ পেলেন। মেয়ের নাম দিব্যা সেনগুপ্ত, বি এ পাশ, বাবা মার একমাত্র মেয়ে। উপরে দুই দাদা। খড়দা কুলিন পাড়ায় নিজেদের বেশ বড় বাড়ি। বাবা রঘুনাথ সেনগুপ্ত ইনকাম ট্যাক্সে ভাল পোস্টে চাকরী করেন। বড়দা রেলে আর ছোড়দা ব্যাঙ্কে কাজ করে। দুজনেরই বিয়ে হয়ে গেছে। শুধু বোনের বিয়ে বাকি। মেয়েটির বয়স ছাব্বিশ বছর। একটা নার্সারি স্কুলে টিচারের কাজ করছে। খুব ভাল ছবি আঁকে ও গান গায়। সাথে মেয়েটার একটা ফটোও পাঠিয়েছে দিদি।

দিব্যা নামের মেয়েটি যে দেখতে ভীষণ সুন্দর সেটা ওর ফটো দেখেই বোঝা যায়। যেমন সুন্দর মিষ্টি মুখ, বড়বড় দুটো চোখ, মাথা ভর্তি চুল, গায়ের রং একটু চাপা ফর্সা দেখেই বোঝা যাচ্ছে। যতটা মনে হয় স্বাস্থ্য বেশ ভালই। বাবা ইনকাম ট্যাক্সে আছেন শুনে ব্যবসায়ি মনোরঞ্জন বাবু নিজের স্বার্থে এই ভদ্রলোকের সাথে আত্মীয়তা করার প্ল্যান করে ফেললেন। মহুয়া দেবীরও মেয়েটিকে খুব পছন্দ হয়ে গেল। ঠিক হল আগামী রবিবার বিকালে ওরা খড়দা যাবেন পাত্রী দেখতে। বড়দির বাড়িতে গিয়ে মেয়ে দেখে একদম ডিনার সেরে ফিরবেন। অনিককে পরের দিনই বলা হল কথাটা। অনামিকা ওর বাচ্চাকে ছেড়ে যেতে পারবেনা বলায় ঠিক হল আপাতত ওরা এই তিনজনই শুধু খড়দায় যাবে অনিকের জন্য পাত্রী দেখতে।

মনোরঞ্জন বাবু বড় শালির বাড়ি থেকে তাকে গাড়িতে তুলে নিয়ে সপরিবারে পাত্রীর বাড়িতে যখন পৌঁছুলেন তখন বিকাল পাঁচটা বেজে গেছে। বড় একটা দোতলা বাড়ির উপরের তলায় থাকেন এরা। নিচে ভাড়া দেওয়া আছে। বড় বাড়ি, অনেকগুলি ঘর আছে দেখেই বোঝা গেল। বসবার ঘরে মেয়ের বাবা মাকে ওঁদের সাথে আলাপ করিয়ে দিলেন মহুয়ার বড়দিদি। মহুয়া দেবীর পড়নে ঢাকাই জামদানী। অনিককে আজ খুব হ্যান্ডসাম লাগছে। ওর পড়নে আজ নস্যি রঙের ম্যাচ করা স্যুট আর টাই। মনরাঞ্জন বাবুও নিল রঙের স্যুট পড়ে এসছেন পাত্রী দেখতে। ডিসেম্বর মাস চলছে। এই সময় কলকাতায় স্যুট পড়ে কোন অসুবিধা হয়না কারো।

একজন মধ্যবয়সী মহিলার সাথে গাড় সবুজ রঙের উপর ছাপা একটা সিল্কের শাড়ি পড়ে এসে ওঁদের নমস্কার করে দাঁড়াল দিব্যা। মহিলাটি ওর বড় বৌদি। একটা খালি সোফার একধারে বৌদির পাশে বসে দিব্যা এক ঝলক দেখে নিল ওর হবু বরকে। অনিক নিজেও তাকিয়েছিল তখন। স্বাভাবিক ভাবেই চোখাচোখি হয়ে গেল দুজনের। মনোরঞ্জন বাবু ছেলের মুখের ভাব দেখেই বুঝতে পাড়লেন ওর মেয়েটিকে পছন্দ হয়েছে। ইতিমধ্যে মহুয়া দেবী দিব্যাকে সাধারন কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করে নিলেন পর মিষ্টি খেতে খেতে রঘুনাথ বাবু অনিককে হেসে প্রস্তাব দিলেন ,’তুমি যদি চাও তো দিব্যার সাথে আলাদা করে কথা বলতে পার। আমাদের কোন আপত্তি নেই। পাশের ঘরে বসে তোমরা বরং একটু কথা বার্তা বলে নাও।’ কথাটা বলেই উনি বড় বৌমাকে ইশারায় দিব্যা আর পাত্র অনিককে পাশের ঘরে নিয়ে যেতে বললেন।

দিব্যাকে একঝলক দেখেই অনিকের ওকে বেশ ভাল লেগে যায়। এরপর ওর সাথে আলাদা করে কথে বার্তা বলে অনিকের মনে হয় যে মেয়েটি বেশ আধুনিক মনস্কা এবং উদার মনের। অনিক লক্ষ্য করল দিব্যা কম কথার মানুষ। তবে ওর প্রতিটি কথার জবাব বেশ স্পষ্ট ও বুদ্ধি করে দিয়েছে। অনিক একবার জজ্ঞাসা করেছিল দিব্যার কোন প্রশ্ন আছে কিনা ওর কাছে। কিন্তু দিব্যা ঘাড় নাড়িয়ে জানায় কোন প্রশ্ন নেই ওর।

মহুয়া দেবী মনোরঞ্জন বাবুকে ফিসফিস করে জানান যে ওনার এই মেয়ে পছন্দ হয়েছে। উনি যেন বুড়োর সাথে একবার কথা বলে নিয়ে যেন আজই দিন ক্ষন পাকা করে নেন। পাত্রীর নিজের বা রঘুনাথ বাবু ও তার স্ত্রী নমিতা দেবীর ছেলেকে বেশ পছন্দ হয়েছিল। ছেলের সাথে আলাদা করে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ওর মতামত জেনে নিলেন মনোরঞ্জন বাবু। শেষে জানুয়ারি মাসের সতের তারিখে ওদের বিয়ের দিন স্থির হল। বড় দিদির বাড়িতে ডিনার সেরে সবাইকে নিয়ে মনোরঞ্জন বাবু এক হাঁড়ি রসগোল্লা নিয়ে বাড়ি ফিরলেন। অনামিকা বাড়িতে একা আছে। ফোনেই দাদা আর বাবা মার মেয়ে পছন্দ হয়ে গেছে শুনে অনামিকা আনন্দে হাততালি দিয়ে বাবাকে মিষ্টি নিয়ে আসতে বলে দিয়েছিল।

মাত্র পঁচিশ দিনের ব্যবধানে অনিক লাহিড়ীর সাথে বিয়ে হয়ে গেল খড়দা কুলিন পাড়ার মেয়ে দিব্যা সেনগুপ্তর। একমাত্র কন্যার বিয়েতে প্রচুর সোনাদানা শাড়ি কাপড় দিয়ে মেয়েকে বিদায় করেছেন দিব্যার বাবা মা। দুই ছেলেও ভাল চাকরী করছে। সুতরাং ওরা কোনরকম কারপন্য করেনি মেয়ের বিয়েতে। আর পাত্র যখন খুবই বড় ঘরের এবং উপযুক্ত ও শিক্ষিত, সেখানে মেয়ের ভবিষ্যৎ ভাল ও সুখের হবে ভেবে মেয়েকে ভরিয়ে দিলেন ওরা। এদিকে মনোরঞ্জন বাবুও সমস্ত আত্মীয় পরিজন বন্ধুবান্ধবকে নিমন্ত্রণ করে বেশ ধুমধাম করেই ছেলের বিয়ে দিলেন।

বিয়ের আচার অনুষ্ঠানের মাঝে বেশ কয়েকবার অনিক দিব্যার সাথে কথা বার্তা বলবার চেষ্টা করল ঠিকই কিন্তু দিব্যা লজ্জায় তেমন ভাবে সারা দিলনা। এমনিতেই মেয়েটা কম কথা বলে, তার উপর অনিক ওর সাথে বন্ধুদের সামনেই যেভাবে ইয়ার্কি ফাজলামি করছিল তাতে ও আরও বেশি লজ্জায় পড়ে যাচ্ছিল। অনিক বেশ ফুর্তিবাজ ছেলে। দিব্যা বারবারই লাজুক প্রকৃতির। অনিক ভাবে এই শামুকের খোলে নিজেকে ঢেকে রাখা মেয়েটাকে সবার সামনে মেলে ধরতে হবে। ওর সমস্ত নিজস্ব গুন গুলিকে পরিস্ফুটিত করে ওকে মেলে ধরতে সাহায্য করতে হবে। দিব্যা লাজুক হলেও অনিক তো আর লাজুক নয়। সুতরাং ধীরে ধীরে দিব্যার লজ্জার ভাবটা কেটে গেলে ওকে ভালোবাসা দিয়ে ভরিয়ে আরও খোলা মেলা একটা প্রানবন্ত মেয়েতে পরিণত করতে হবে ওকেই। অনিক এম বি এ করা ছেলে। দারুণ একটা মার্কেটিং স্কিল আছে, ও নিশ্চয়ই পাড়বে দিব্যাকে পাল্টাতে।

ফুলশয্যার রাত, অনিকের বেডরুম রজনীগন্ধার ঘ্রানে ভরে উঠেছে। সুন্দর করে বিভিন্ন নামী অনামী ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে অনিকের বিছানা। সব স্ত্রী আচার হয়ে যাবার পড় ঘরের দরজা বন্ধ করে ঘুরে দাঁড়াল অনিক। দিব্যা মাথায় ঘোমটা টেনে খাটের উপর দুই পা তুলে মুখ গুঁজে বসে আছে। অনিক ধীর পায়ে ওর সামনে গিয়ে বসে ও দিব্যার মুখের ঘোমটা তুলে ধরে। দিব্যার বুকের ভিতরে তখন ঢিব ঢিব আওয়াজ হচ্ছে। বেচারি মনে মনে ঠাকুরকে ডাকছে যাতে প্রথম রাতেই অনিক ওর শাড়ি কাপড় সব খুলে একাকার না করে বসে। ওর বান্ধবীদের অনেকের সেরকম অভিজ্ঞতা হয়েছে দিব্যা শুনেছে। ওর বরটা আবার কি রকম কে জানে ?

কিন্তু না, অনিক সেই পথে গেল না। বরং গভীরভাবে দিব্যাকে জড়িয়ে ধরে ওর গালে একটা চুমু দিয়ে পাশে বসে অনেক কথা বলল অনিক। দিব্যার জীবনে যত কিছু শখ বা ইচ্ছা বাকি আছে তার সবকিছু ও পুরণ করবে এবং  ওকে সুখের সাগরে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে প্রতিশ্রুতি দিল অনিক। দিব্যা যদি কখনো চায় গান শিখতে তাহলে সেটা ও করতে পারে, অনিক ওকে সব রকমের সাহায্য করবে। এমন কি দিব্যা ভাল আঁকতে জানে শুনেছে, সুতরাং ইচ্ছা হলে দিব্যা কোন ভাল আর্টিস্টের কাছে আঁকা শিখতে চাইলে তারও ব্যবস্থা করে দেবে কথা দিল। এভাবেই অনেক রাত পর্যন্ত দিব্যাকে অনেক স্বপ্ন দেখিয়ে নিজের মনের কথাগুলি শেয়ার করল অনিক। অবশেষে একসময় সারাদিনের ক্লান্তিতে দুজনেই ঢলে পড়ল গভীর ঘুমে।

অনামিকার বর, মানে অনিকের জামাই বাবু আগে থেকেই কলকাতা থেকে গোয়ার প্লেনে যাতায়াতের টিকিট কেটে এবং গোয়াতে ক্যালাঙ্গুট বিচের কাছে একটা বড় হোটেলে পাঁচদিনের জন্য একটা স্যুট বুক করে দিয়ে অনিকদের হনিমুনের বন্দোবস্ত করে রেখেছিল। জামাই নিজে চাকরী করে একটা বড় মালটি ন্যাশনাল টুরিস্ট কোম্পানিতে ওঁদের দিল্লির হেড অফিসে। প্রায়ই ওকে বিদেশে যেতে হয় অফিসের কাজে। শ্বশুরকে গোপনে জিজ্ঞাসা করেছিল অনিককে হনিমুনে ব্যাঙ্কক বা সিঙ্গাপুর পাঠাবে কিনা ? কিন্তু অনিকের শরীরের কথা ভেবে মনোরঞ্জন বাবু ওকে বিদেশে পাঠাতে মানা করেছিলেন। সুতরাং জামাই গোয়াতে ওদের বেড়াবার সব বন্দোবস্ত করে নিজের খরচে। বৌভাতের পরদিন অনিকের হাতে তুলে দেওয়া হয় ওর সারপ্রাইজ গিফট।

অষ্টমঙ্গলার পরদিনই দুপুরের ফ্লাইটে অল্প কিছু লাগেজ সাথে নিয়ে অনিক আর দিব্যা বেড়িয়ে পড়ল গোয়ার উদ্দেশে। অনামিকা ওর বরের সাথে সন্তান সহ সকালের ফ্লাইটেই দিল্লি রওনা দিয়ে দিয়েছে। বাড়িতে রইলেন শুধু মনোরঞ্জন বাবু ও তার স্ত্রী এবং ঝি চাকর ইত্যাদি। অনিককে আলাদা করে বারবার সমুদ্রে স্নান করতে বা বোটে চড়ে স্কাই ডাইভিঙ্গে যেতে মানা করে দিয়েছে ওর বাবা। ঠিক ঠিক সময় মত ওষুধ বিশুধ যেন খেয়ে নেয় সেই পরামর্শ দিতেও ভোলেননি উনি। যদিও আজ প্রায় একমাস হল অনিকের কাশির সাথে আর কখনো রক্তপাত হয়নি, হয়তো বা ওষুধের এফেক্ট, কিন্তু তাও মনোরঞ্জন বাবু ছেলেকে নিয়ে বেশ দুশ্চিন্তায় রইলেন।

দিব্যা অনিক খাবার আগে বা পড়ে কয়েকটা ওষুধ খায় দেখে ওকে বৌভাতের পরদিন রাতেই জিজ্ঞাসা করেছিল এগুলি কিসের ওষুধ, রোজ কেন এই ওষুধ খেতে হয় ওকে ? সেদিন ওর সুগার আছে বলে ব্যাপারটা এড়িয়ে গেছে অনিক। ওর যে লাঙের অসুখ সেটা একদম চেপে যায় অনিক। তবে একটা সত্যি কথা বলেছে দিব্যাকে যে আগে ও অনেক সিগারেট খেত, কিন্তু এখন একদমই খায়না। কারন হিসাবে আবার মিথ্যা বলেছে যে ওর ডাক্তার সুগার আছে বলে সিগারেট খেতে স্ট্রিক্টলি বারণ করে দিয়েছেন ওকে। দিব্যা সব শুনে বরং খুশিই হয়।

ক্যালাঙ্গুট সি বিচ গোয়ার অন্যতম সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশের একটি। সেখানেই সমুদ্রের কাছেই হোটেল ‘দ্য ক্রাউন গোয়া’ একটি ফাইভ স্টার হোটেল। চার তলায় খুব সুন্দর বড় একটা সুটে বুকিং ছিল ওঁদের। এয়ারপোর্ট থেকেই হোটেলের গাড়ি ওদের পিক আপ করে নিয়ে আসে হোটেলে। তখন প্রায় সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। দিব্যা ঘরের জানলা দিয়ে সমুদ্র দেখা যাচ্ছে দেখে মোহিত হয়ে যায়। গোয়ার কথা অনেক শুনেছে, কিন্তু এই প্রথম ওর গোয়াতে আসা। পাহাড়ের উপর একটা টিলায় মিলিটারি এয়ারপোর্ট ও সমুদ্রের ধার ঘেঁসে শহরে ঢুকবার গাছে ঘেরা রাস্তা দেখেই দিব্যা বেশ বুঝতে পেড়েছিল যে গোয়া শহরটা সত্যিই ভীষণ সুন্দর জায়গা। অনামিকার জামাই লোকটি বেশ রসিক মানুষ। মনে মনে ওর পছন্দের তারিফ না করে পারল না দিব্যা।

অনিক আজ পর্যন্ত দিব্যাকে একান্তে জড়িয়ে ধরা বা চুমু খাওয়ার বেশি কিছু করে উঠতে পারে নি। দিব্যা লাজুক ভাবে ওর প্ররোচনায় সন্মতি জানালেও নিজে থেকে এখনো কোন আগ্রহ দেখায়নি এই ব্যাপারে। অনিক মনে মনে আজকের রাতটাকে স্মরণীয় করে তুলবার পরিকল্পনা করতে থাকে। দিব্যাকে ঘরে চেঞ্জ করতে বলে নিজে চলে যায় নিচে রিসেপ্সনে। পাশেই একটা ফুলের স্টল আছে ও ঢুকবার সময়েই দেখে রেখেছে। এখন শীতের সিজনে অনেক রকম ফুলের বাহার সাজিয়ে রাখা ছোট্ট দোকানটার চারিদিকে। অনিক বেছে বেছে বেশ কিছু সিজন ফ্লাওয়ার নিয়ে আবার চলে এল ঘরে।

অনিক সাথে ঘরের লক ওপেনার কার্ড নিয়েই গিয়েছিল। সোয়াইপ করে ঘরে ঢুকে দেখল দিব্যা তখন বাথরুমে স্নান করছে। মেয়েটি খুব পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকতে ভালোবাসে। এই কলকাতা থেকে এতটা পথে এসে স্বামীর সাথে এক সাথে হনিমুন করতে গিয়ে দিব্যা এভাবে নিজেকে প্রস্তুত করে নিচ্ছে দেখে অনিকের খুব ভাল লাগে। বৌকে সারপ্রাইজ দেবার জন্য সারা ঘরের আসবাবপত্রে ও বিছানায় ছড়িয়ে দেয় সব ফুল। যদিও ফুলদানিতে আগেই কিছু ফুল সাজানো ছিল, তা সত্যেও অনিক আজ নিজের মত করে সাঁজাতে চেয়েছিল ওদের বেডরুম।

দিব্যা একটা সুন্দর নাইটি পড়ে বাথরুম থেকে বেড় হয়ে ঘর ভর্তি এতো ফুল দেখেই বুঝতে পারে এটা ওর পাগল বরটার কাণ্ড। ওপাশে সোফায় চুপ করে বসে থাকা অনিকের দিকে তাকিয়ে হেসে বলে ওঠে, ‘এসব কি করেছ তুমি ? এই এতো ফুল এনেছ কেন গো ?’

অনিক ওর দিকেই তাকিয়ে বসেছিল। মুখে একটা দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল ওর। হেসে জবাব দিল, ‘আমি আনিনি তো ! এনেছে কাম দেব। এই তো এই মাত্র সব সাজিয়ে রেখে গেলেন উনি। যাবার সময় আবার আমার সাথে হ্যান্ড সেক করে বললেন – আল দ্য বেষ্ট।’ দিব্যার মুখটা লজ্জায় লাল হয়ে ওঠে। ওর মনের ভিতরে সেতারের ঝংকার শুনতে পায় দিব্যা। বেশ বুঝতে পারে আজ ওর আর রক্ষা নেই। আজ ওর এই পূজারী মন্দিরের দ্বার উদ্ঘাটন করে তবে ছাড়বে। মুখ নিচু করে হেসে এগিয়ে যায় ড্রেসিং টেবিলের দিকে আর ফিস ফিস করে বলে, ‘আহা,একটা অসভ্য কোথাকার।’

রাত সাড়ে নটায় ঘরেই খাবার দিয়ে যায়। পালক চিকেন, বাটার নান, বাদশাহি পোলাউ ও ল্যাম্ব দিয়ে ডিনার সেরে নিল ওরা। খেয়ে উঠে দুজন বারান্দার ব্যালকনিতে বেতের সোফায় সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে বসে রইল কিছুক্ষণ। সমুদ্রের পার বলেই বাইরে কলকাতার মত অত ঠাণ্ডা নেই। তবুও দিব্যা একটা শাল জড়িয়ে বসেছিল। কাছেই পাজামা ও হাফ পাঞ্জাবী পড়ে বসেছিল অনিক। কথা বলতে বলতে হঠাত বলে উঠল,’বাবা, বেশ ঠাণ্ডা হওয়া আসছে তো..।’ বলেই বেতের চেয়ারটা টেনে দিব্যার একদম পাশে বসে পড়ল অনিক। আর তারপরেই দিব্যার শালের একপাশটা জড়িয়ে নিল ওর গায়ে। একই শালের তলায় ঢুকেই দিব্যাকে বাঁ হাত দিয়ে জড়িয়ে বসে রইল অনিক। ধীরে ধীরে সেই বা হাত দিব্যার বাঁ হাতের নিচ দিয়ে গিয়ে ওর বা স্তনের উপর চেপে বসল।

দিব্যা অনিকের মতলব সব বুঝতে পাড়ছিল, কিন্তু কিছু বলল না। সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে অন্য কথা বলতে চেষ্টা করে চলল। কিন্তু ভিতরে ভিতরে ওর শরীর উত্তেজনায় গরম হয়ে গেছে। গলা দিয়ে আওয়াজ বেড় হল কেঁপে কেঁপে। অনিক ডান হাতে দিব্যার মুখ ঘুড়িয়ে নিজের পাশে এনে ওর দুটো আঙ্গুরের মত লাল ঠোঁটে চেপে ধরল নিজের ঠোঁট দুটো। দিব্যা এই শান্ত পরিবেশে অনিকের আদরে বিবশ হয়ে চোখ বুজে পড়ে রইল। এ যেন দুজন একইভাবে মাহাযুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে ব্যাস্ত। একজন পরিকল্পিত ভাবে আগ্রসর হচ্ছে আরেকজন পরাজয় স্বীকার করে শুধু নিজেকে আরেকজনের বাহুডোরে নির্বিবাদে সপে দিচ্ছে।

বেশিক্ষণ এইভাবে বসে থাকতে হলনা। অনিকের তখন রক্তে ঢেউ উঠে গেছে। ক্ষুধার্ত বাঘের মত অবস্থা ওর। কিন্তু হরিণ শিকারের আগে যেভাবে বাঘ পা টিপে টিপে শিকারের দিকে এগোয় সেইভাবেই অনিক এগোতে চাইছিল সেই চূড়ান্ত মুহূর্তের দিকে। দিব্যা শিক্ষিতা ও নম্র স্বভাবের মেয়ে। তার কাছে নিজেকে কিছুতেই একটা হ্যাংলা পুরুষের মত মেলে ধরতে পারবেনা ও। হ্যাঁ স্বামী স্ত্রীর শারীরিক মিলনের আনন্দ নেওয়াটা নিশ্চয়ই হবে, কিন্তু সেটা যেন কখনই একটা জোর জবরদস্তির পর্যায় না যায়।

অনিক একটু বাদে নিজেকে সংযত করে বলল,’চল ঘরে যাই। এখানে বেশ হাওয়া আসছে।’ বলেই দিব্যার একহাত ধরে উঠে ঘরের দিকে পা বাড়াল। দিব্যার কিন্তু এইভাবে জড়াজড়ি করে বসে থাকতে খুব একটা খারাপ লাগছিল না। কিন্তু আবার ভাবল না বললে হয়ত অনিক কষ্ট পাবে। তাই দিব্যাও ‘হ্যাঁ, চল’ বলে ঘরের দিকে পা বাড়ায়। অনিক দরজা বন্ধ করে বাথরুমে চলে যায় আর দিব্যা বিছানায় গা এলিয়ে শুয়ে পড়ে। সন্ধ্যায় হোটেলে এসে স্নান করায় এখন বেশ আরাম বোধ করছে। বিছানায় শুয়ে পড়ে দিব্যা বেড সুইচটা নিভিয়ে দিল। ঘরের নাইট লাম্পে প্রায় সবই দেখা যাচ্ছে, সুতরাং বড় লাইটটার আর কি দরকার।

অনিক বাথরুম থেকে বেড়িয়ে দেখে ঘর প্রায় অন্ধকার। দিব্যা অর্ধেক বিছানা জুড়ে চোখ বুজে শুয়ে আছে। দেখে মনে হয়না ও ঘুমিয়ে পড়েছে। অনিক আস্তে আস্তে দিব্যার পাশে গিয়ে শুয়ে একটা হাত ওর মাথায় রেখে বলল,’কি হল , শরীর ঠিক আছে তো তোমার ? আলো নিভিয়ে দিলে যে ?’

দিব্যা চোখ খুলে ফিস ফিস করে বলল,’শরীর ঠিক আছে। আলোটা বড্ড চোখে লাগছিল তাই নিভিয়ে দিলাম।’

‘বাঃ আমি তোমাকে আজ প্রাণ ভরে দেখব ভাবলাম যে , তার কি হবে ?’ বলেই অনিক ঝুঁকে পড়ল দিব্যার উপর। দিব্যা জানে এর মানে কি। দু হাত দিয়ে মুখ ঢেকে একই ভাবে ফিসফিসিয়ে বলল,’আমার লজ্জা লাগে। তুমি লাইট জ্বলাবে না বলছি।’

অনিক মজা করার জন্য হাতদুটো দিব্যার ঘাড়ে বুকে মুখে ঘুড়িয়ে ঘুড়িয়ে বলে,’ বাঃ, আমি তো কিছুই দেখতে পাচ্ছিনা। এটা কি, এটা তো মনে হচ্ছে তোমার ঠোঁট, আর এটা বোধ হয় মাথা, আর এটা নিশ্চয়ই ……’

কথা কথা বলতে বলতেই অনিক দিব্যার নাইটির বোতাম খুলতে থাকে। দিব্যা নিচে কোন অন্তর্বাস পড়েনি। ওর পরিপুষ্ট স্তনে হাত রেখে অনিকের সমস্ত শরীরে আগুন লেগে যায়। ধীরে ধীরে দুজনার মাধ্যেকার সমস্ত বাঁধা সরে যায়। অনিকের মুখ নেমে আসে দিব্যার উন্মুক্ত শরীরের আনাচা কানাচে। ঘরের আলো আধারি পরিবেশে মুহূর্তে দুখানা তপ্ত শরীর মিলেমিশে এক হয়ে যায়। স্বর্গীয় সুখে ভেসে যায় দুজনের তন মন। পরিতৃপ্তির শব্দে চমকে চমকে ওঠে ঘরের আলোগুলি। এই এক মুহূর্তের মধ্যে ওদের দুজনেরই জীবন থেকে বিলীন হয়ে যায় সমস্ত দুঃখ কষ্ট হতাশা । এ যেন এক অন্য পৃথিবী, এক অন্য জগত, যেখানে শুধুই আনন্দ আর আনন্দ।

আজ এভাবে প্রথম দুটো দেহ মনের এক হয়ে যাওয়া অনিকের মনে এনে দিল এক চূড়ান্ত স্বর্গীয় সুখ। সারারাত কম্বলের নিচে দিব্যার নরম দেহটাকে সাপের মত পেঁচিয়ে ঘুমিয়ে রইল অনিক। দিব্যার ঘুম এলো অনেক পড়ে। একদিকে আনন্দে ওর মন প্রাণ যেমন ভরে উঠেছে , তেমনই মনের কোনে জমতে শুরু করেছে একটা ছোট্ট কালো মেঘ। আজ নাহয় রাতের আঁধারে অনিকের দৃষ্টি এড়ানো গেল, কিন্তু কাল বা পরশু কি হবে ? পাঁচদিন এই হোটেলে শুধু ওরা দুজন। কি ভাবে অনিকের চোখকে ফাঁকি দেবে দিব্যা ?

পরদিন সকালে স্নান করে ব্রেকফাস্ট করেই হোটেলের গাড়িতেই ওরা দুজন চলে গেল ক্যালাঙ্গুট বিচ, বাগা বিচ, ভাগাটোর বিচ ,আরামবোল বিচ ইত্যাদি দেখতে। সন্ধ্যার মুখে ঠিক ছয়টা নাগাদ হোটেলে ফিরে এলো দুজন। আসবার পথে ক্যালাঙ্গুট মার্কেটে গাড়ি দাঁড় করিয়ে কিছু ভ্যানিটি ব্যাগ ও ঘর সাজাবার জিনিষ ইত্যাদি কিনল দিব্যা। অনিক কিনল দুখানা বিদেশি ডিজাইনের টুপি ও একটা কালো গগলস। ওর নিজের দামী গগলসটা আনতে ভুলে গেছিল অনিক। দেখাদেখি দিব্যাও অনিকের পছন্দ করা একটা গগলস কিনে নিল।

ঘরে এসে সারাদিনের ক্লান্তি দুর করতে ও গোয়ার নোনা আবহাওয়া থেকে শরীরের ত্বক বাঁচাতে দিব্যা ঢুকে গেল স্নান করতে। অনিক চাইছিল একসাথে স্নান করবে ওরা। কিন্তু দিব্যা একপ্রকার জোর করেই ওকে বাথ্রুমের দরজা থেকে ফিরিয়ে দিয়ে নিজে টুক করে বাথরুমে ঢুকেই দরজা বন্ধ করে দেয়। সন্ধ্যা হয়ে আসছে দেখে অনিক আর বাড়াবাড়ি করল না, কিন্তু মনেমনে ভেবে রাখল ‘কাল তোমায় ছাড়ছিনা রাধিকে।’ পরদিন ওদের প্রোগ্রাম ছিল গোয়ার বিখ্যাত ডেল্ট ইন জ্যাক ক্রুসে খাওয়া দাওয়া ও ক্যাসিনোতে সময় কাটানো।

রাতের খাবার খেয়ে দুজনে আজ আর বাইরের বারান্দায় বসল না। কয়েক মিনিট ঘনিষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে রাতের আকাশের সৌন্দর্য উপভোগ করছিল ওরা। কিন্তু অনিক ভিতরে ভিতরে তখন ছটফট করছে। কতক্ষনে গিয়ে শোবে আর আদরে আদরে ভরিয়ে দেবে ওর প্রাণ ভোমরাকে। মেয়েটা সত্যিই দারুণ। যেমন সুন্দর ওর চেহারা আর তেমনই ওর আচার ব্যবহার। এমন একটা মেয়েকে ভালো না বেসে থাকা যায়। দিব্যা মাত্র এই কয়দিনেই অনিকের মনের গভীরে স্থান করে নিয়েছে। এখন দিব্যা ছাড়া যেন ওর চারিপাশ অন্ধকার।

দিব্যা আজও বড় লাইট নিভিয়ে নাইট ল্যাম্প জ্বালিয়ে শুয়ে পড়ল বিছানায়। অনিক রোজকার অভ্যাস মত বাথরুম সেরে শুতে এসে দেখে আজও ঘরটা একটা আলো আধারি পরিবেশ তৈরি করে ওদের বিরুদ্ধে একটা চক্রান্তে মেতে উঠেছে। যেই চক্রান্ত কয়েক মুহূর্তেই দুজনকে বিবস্ত্র করে কাম দেবের ভেলায় ওদের বসিয়ে পাঠিয়ে দেবে স্বর্গীয় আনন্দের নন্দন কাননে। মেতে উঠবে দুজনের দেহ মন একে অপরকে আরও ভাল ভাবে চিনবার ও জানবার এক লুকোচুরির দুষ্টু খেলায়। মুচকি হেসে অনিক এগিয়ে গেল বিছানার দিকে। আর ওকে কাছে আসতে দেখেই বালিশে মুখ লুকোল দিব্যা, ওর মুখে তখন সুখের হাসি ফুটে উঠেছে। সারারাত অনিক দিব্যার নরম দেহটাকে তছ নছ করে ওর দেহের ক্ষুধা মেটাল আর দিব্যাও মেতে উঠল সেই খেলায়।

সকাল দশটায় নিচে গাড়ি ওঁদের জন্য অপেক্ষা করবে। বেলা পৌনে আটটায় ঘুম থেকে উঠে চা খেয়ে দুজনেই বাথরুম সেরে নিল আগে। অনিক আগের দিনের মত আর আগে স্নান করল না। বাইরে এসে সোফায় পেপার পড়ার ভাণ করে বসে রইল। প্রাতঃকার্য সম্পন্ন করে দিব্যা বাইরে এসে ওর আন্ডার গারমেন্টস নিয়ে বাথরুমে গিয়ে সেগুলি ওপরের ষ্টীলের রডের তাকে রাখতে গিয়ে হটাত দেখল পিছন থেকে অনিক বাথরুমে ঢুকেই আগে দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। অনিকের পড়নে শুধু তোয়ালে আর দিব্যার গায়েও শুধু তোয়ালে জড়ানো। অনিককে বাথ্রুমের দরজা বন্ধ করতে দেখেই চমকে উঠল দিব্যা।

অনিকের সব কাজের পিছনেই থাকে নিখুত পরিকল্পনা। আগের দিনই অনিক দেখেছে দিব্যা তোয়ালে গায়ে জড়িয়ে বাথ্রুমের দরজা ফাঁক করে বেড়িয়েই বিছানার উপর রাখা আন্ডার গার্মেন্টস গুলি তুলে নিয়ে আবার বাথরুম বন্ধ করে স্নান করেছে। গতকাল সন্ধ্যায় অনিক চেষ্টা করেও ভিতরে ঢুকবার সুযোগ পায়নি। কিন্তু আজ ও তক্কে তক্কে ছিল, সুযোগ আসতেই সোজা একেবারে ভিতরে ঢুকেই দরজা বন্ধ করে দেয়, যাতে দিব্যা আবার  পালাতে না পারে। আজ ওকে দিব্যার অপরূপ সৌন্দর্য চাক্ষুস করতেই হবে, না হলে এটা হবে ওর পরাজয়।

দিব্যা দেখে অনিকের মুখে চোখে বিজয়ীর হাসি ফুটে উঠেছে। এবার ও কি করবে ? বাথ্রুমের স্বচ্ছ আলোয় ও কি করে আজ নিজেকে লুকিয়ে রাখবে। আজতো ও পুরোপুরি ভাবে অনিকের নজরে ধরা পড়ে যাবে। অজানা এক আশঙ্কায় দিব্যার বুকের ভিতরটা ঢিব ঢিব করতে থাকে। এদিকে অনিক দিব্যার এই অপ্রস্তুত অবস্থার সুযোগ নিয়ে সাওয়ার চালু করে দিয়ে এক টানে দিব্যার তোয়ালে খুলে ফেলে ওকে বুকে টেনে নেয়। দিব্যা ভয়ে লজ্জায় চোখ বুজে অনিকের বুকে মুখ গুঁজে সাওয়ারের জলে চপচপে হয়ে ভিজতে থাকে।

দুজনেই তখন সম্পূর্ণ ভাবে বিবস্ত্র হয়ে সাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে। অনিক দিব্যাকে দুইহাতে ধরে একটু এগিয়ে দিয়ে ওর নগ্ন শরীরের উপর নজর দিয়ে অবাক নয়নে দেখতে থাকে। দিব্যা কিন্তু চোখ খোলেনা, ও চোখ বুজেই এক অজানা আশঙ্কার ভয়ে প্রায় কাঁপতে থাকে। ওর সমস্ত শরীর দিয়ে বয়ে চলেছে জলের ধারা। একজন সম্পূর্ণ নগ্ন যুবতীর শরীর এই প্রথম চাক্ষুস করল অনিক। দিব্যা কত সুন্দর কত স্নিগ্ধ ওর রূপ। অপূর্ব মিষ্টি ওর মুখ,বড়বড় চোখ, সুগঠিত স্তন, হরিণীর মত কোমল শরীরে পিঁপড়ের মত ক্ষিন কোটি দেশ। আর ঠিক তখনই অনিকের নজরে পরল দিব্যার বা দিকের স্তনের ঠিক নিচে সাদা সাদা কিছু দাগ।

সাওয়ারের জলে প্রথমে ভাল করে দেখতে না পেয়ে অনিক ঝুঁকে পড়ে দিব্যার বা স্তনে হাত দিয়ে একটু উপর দিকে তুলে ধরতেই ওর নজরে পড়ল দিব্যার শরীরের শ্বেতীর দাগ ওর বাম স্তনের ঠিক নিচে। অনিক অবাক হয়ে ডান দিকের স্তনে হাত রেখে সেটাও তুলে ধরল। না সেখানে কিছু নেই। কিন্তু পিঠের মাঝে দেখা গেল আরও একটা শ্বেতীর ছাপ। যেন ছোট্ট একটা রাজ্যের ম্যাপ আঁকা ওখানে। দিব্যা কিন্তু না দেখেও বুঝতে পাড়ছিল সব।

দিব্যা জানে আজ ওর এই শ্বেতী রোগের কথা জানতে পেরে অনিক নিশ্চয়ই খুব অবাক হয়ে যাবে। ওর মনে হয়ত জমে উঠবে দিব্যার প্রতি চূড়ান্ত ঘৃণা ও রাগ। ওদের এই সুন্দর ভালোবাসার সম্পর্কে নেমে আসবে এক কালবৈশাখীর ঝড়, ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে যাবে ওদের এই মধুর স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক। নিশ্চয়ই ওর রোগের কথা গোপন করবার জন্য মনে মনে শুধু দিব্যা নয় ওর বাবা মাকেও চূড়ান্ত ভাবে গালাগালি ও অভিশাপ দেবে অনিক। সাওয়ারের তলায় দাড়িয়েও ওর শরীর যেন ঘেমে উঠল। চোখের কোনে জল জমে আসছে দিব্যার। কি ভাবছে এখন অনিক ? তাহলে কি অনিক ওকে ওর জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেবে, ডিভোর্স দেবে দিব্যাকে ?

বিস্মিত অনিক কিন্তু কোন প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করল না। উল্টে একসাথে স্নান করবার মজাটা নষ্ট হতে দিলো না। ও বেশ বুঝতে পাড়ছিল যে দিব্যা এই ভয়েই হয়ত রাতে বড় লাইট নিভিয়ে দেয় এবং ওর সাথে একসাথে স্নান করতে চায় না। মনের ভিতর তোলপাড় শুরু হলেও অনিক বুদ্ধিমানের মত সবটাই চেপে গেল এবং দিব্যাকে বিভিন্ন ভাবে উত্যক্ত করে ওকে বুঝতেই দিলো না যে ওর গায়ের শ্বেতীর দাগ গুলি দেখে অনিক খুব অবাক হয়ে গেছে। যেন কিছুই হয়নি এরকম ভাব দেখিয়ে দিব্যার সাথে স্নান সেরে নিল অনিক। বেলা হয়ে যাচ্ছে। ওদের আজ সাড়ে দশটায় বেড়তেই হবে। ব্রেকফাস্ট করে বেড় হবার কথা, আর দেড়ি করা যাবে না।

অনিক সাওয়ারে স্নান সেরে বেড়িয়ে গেল ঠিকই , কিন্তু দিব্যাকে ফেলে দিয়ে গেল এক সাগর চিন্তায়। দিব্যার সাথে এরমধ্যে বেশ কয়েকবার চোখাচোখি হলেও দিব্যা অনিকের চোখে কোনরকম বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখতে পেল না। যেন এই যুগল স্নানটা ভীষণ ভাবে এঞ্জয় করেছে লোকটা। বেড় হবার আগে দিব্যাকে জড়িয়ে ধরে একটা গভীর চুম্বন দিতেও ভোলেনি অনিক। আর তাতেই দিব্যা আরও বেশি অবাক হয়ে যায়। ওর মনে একটা মিশ্র প্রতিক্রিয়া হয়। কি হল ব্যাপারটা ,অনিক কি এই দাগ গুলি দেখে কিছু বুঝতে পারল না নাকি ব্যাপারটাকে কোন গুরুত্ব দিতে চাইল না ? ও কি ভাবছে তাতে দিব্যা অপ্রস্তুত হয়ে পড়বে ? কিন্তু ও তো মনে মনে সব রকম পরিস্থিতির জন্য আজ প্রস্তুত। ভগবান যদি ওর কপালে সুখ লিখে না দেন তাহলে দিব্যার কিই বা করার আছে ?

দিব্যা এক অদ্ভুত দোদুল্যমান অবস্থায় পড়লেও তাড়াতাড়ি স্নান সেরে বেড়িয়ে ড্রেস করে তৈরি হয়ে নিল। ও দেখল অনিক এরই মধ্যে জিন্সের প্যান্ট, টি সার্ট আর নতুন কেনা একটা ম্যাচিং টুপি পড়ে একদম রেডি। দিব্যাকে বেড় হতে দেখেই হেসে বলল,’দেখতো কেমন লাগছে আমায় ? অনেকটা চার্লস ব্রন্সনের মত লাগছে না ? সেই যে টেক্সাস ফিল্ম জ্যাঙ্গো সিনেমার সেই নায়ক।’

দিব্যা জানে যে অনিক ইংরাজি ক্লাসিক ফিল্মের ভক্ত। প্রায়ই গ্রেগরি পেক, চারলটন হেষ্টন, ওমর শেরিফ এদের পুরানো বিখ্যাত সব সিনেমার গল্প শোনায় ওকে। কিন্তু এই চার্লস ব্রন্সন লোকটার কথা ওর মনে পড়ল না। মুচকি হেসে বলল,’একেবারে তাই। ফাটাফাটি লাগছে এই টুপিটাতে।’ অনিককে দিব্যাও বুঝতে দিলনা যে ওর ব্যবহারের গোপন তথ্য জানতে ও ভিতরে ভিতরে কতটা উদগ্রীব। দিব্যা অনিকের ব্যাবহারে কোন পরিবর্তন না দেখে ওর এই সাময়িক শান্তিতে কোন বিঘ্ন ঘটাতে চাইল না। এণ্টি চেম্বারে ঢুকে তাড়াতাড়ি নিজেকে তৈরি করে নিল। নীল রঙের ম্যাচ করা সালোয়ার কামিজ পড়ে হাল্কা সেজে গুঁজে বাইরে এসে অনিককে জিজ্ঞাসা করল, ‘আর আমাকে কেমন দেখাচ্ছে সেটা বল।’

অনিক এগিয়ে এসে দিব্যার ওড়নাটা ঠিক করে দিয়ে মুখটা তুলে ধরে এদিক ওদিক ঘুড়িয়ে বলল,’আমার কিন্তু তোমাকে এক সাইড থেকে কিছুটা সোফিয়া লরেন আরেক সাইড থেকে কিছুটা জিনত আমনের মত লাগছে। তবে আমার দৃঢ় ধারনা যে তুমি হলে আমার প্রাণ ভোমরা দিব্যা।’ বলেই সরু চোখে তাকায় অনিক। তারপর দুজনেই একসাথে হো হো করে হেসে দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরে। অনিকের এই আন্তরিক ব্যাবহারে মুগ্ধ হয়ে যায় দিব্যা। মনে মনে ভগবানকে ধন্যবাদ দেয় ওকে অনিকের মত একজন সৎ ও মহান স্বামী দেবার জন্য।

এরপরের তিনদিন পানাজি ও গোয়ার সমস্ত দর্শনীয় স্থান ও ওল্ড গোয়ার বিখাত ঐতিহাসিক সব পুরানো গির্জা, ফোর্ট এসব দেখেই কেটে গেল। রাতে অনিকের ব্যবাহারে কোন পরিবর্তন লক্ষ্য করল না দিব্যা। উল্টে তৃতীয় রাত থেকে দিব্যা আর বড় লাইট নেভালো না। সঙ্গম ক্লান্ত অনিক নিজেই লাইট নিভিয়ে ঘুমিয়ে পড়ত।

কলকাতায় ফিরে এসে অনিক কিন্তু কিছুই জানাল না কাউকে। এই কয়দিন দিব্যার শরীরের ওই শ্বেতীর দাগ নিয়ে অনেক ভেবছে অনিক। এই এতদিনে দিব্যার শরীরের এই রোগের কোনরকমের খোঁজ ওরা কেউই আগে পায়নি। আর পাবেই বা কি ভাবে ? শুধু মাত্র দিব্যার বাঁ দিকের স্তনের ঠিক নিচে এবং পিঠের মাঝে , ঐ দুই জায়গায় শ্বেতীর দাগ আছে দেখা গেল। কিন্তু দিব্যার শরীরের ওই দু’টি জায়গা তো সবসময়েই ঢাকা থাকে। সুতরাং একমাত্র দিব্যার নিজের ছাড়া ওর স্বামী অনিকেরই শুধু জানবার কথা এটা। গোয়াতে একসাথে স্নান করতে না গেলে অনিক নিজেও হয়ত কোনদিনই ওর এই গোপন রোগের কথা জানতেও পাড়ত না।

অনিক অফিসে বসে কয়েকদিন যাবত শ্বেতী রোগের কারন, লক্ষন ও এই রোগের ব্যাপারে বাকি সমস্ত তথ্য ইন্টারনেট থেকে জেনে নিল। যেহেতু দিব্যার শরীরের মাত্র দুই জায়গায় এই লক্ষন দেখা গেছে অনিকের মনে হল এটা নিশ্চয়ই দিব্যার ফার্স্ট স্টেজ। কয়েকদিন বাদেই শিয়ালদায় ডাক্তার মুখারজির চেম্বারে গিয়ে হাজির হল অনিক। ডাক্তার মুখারজি একজন স্কিন স্পেশালিষ্ট। অনেকদিন আগে কলেজ লাইফে একবার ঘাড়ের কাছে জামার কলারের জায়গায় চুলকানি রোগ হয়েছিল ওর। তখনই এক বন্ধুর সাথে অনিক এসেছিল ওনার চেম্বারে দেখাতে। কাউকে কিছু না জানিয়ে সন্ধ্যাবেলা এসে ওনার চেম্বারে হাজির হল অনিক।

ডাক্তার মুখারজি খুব বয়স্ক ও অভিজ্ঞ স্কিন স্পেশালিষ্ট। অনিকের মুখে দিব্যার দেহের দুই জায়গায় এইরকম দাগের কথা শুনে উনি বললেন,’আমার মনে হচ্ছে এটা একদম ইনিসিয়াল স্টেজ। আমি একবার রোগীকে নিজের চোখে দেখতে চাই। আপনি একদিন ওকে নিয়ে আসতে পারবেন মিস্টার লাহিড়ী ?’

অনিক এই ভয়টাই পাচ্ছিল। সঙ্গে সঙ্গে আনবার ব্যাপারে না গিয়ে জিজ্ঞাসা করল,’আচ্ছা ডাক্তার বাবু, এটা সেরে যাবার চান্স আছে ? আর যদি সেরেও যায়, তাহলেও ভবিষ্যতে সন্তানদের উপর কি এর কোন এফেক্ট পড়বার চান্স থেকে যাচ্ছে ? একটু যদি খুলে বলেন।’ অনিকের চোখে অনেক জিজ্ঞাসা তখনও।

ডাক্তার মুখারজি স্মিত হাসি হেসে বললেন,’প্রথমত আমি রোগীকে না দেখে এবং কয়েকটা টেস্ট না করে কিছু কনফার্ম করতে পারব না। আর দ্বিতিয়ত আপনি যা ভয় পাচ্ছেন সেটা কিন্তু সবসময় হয়না। একটা কথা কিন্তু জানবেন যে এই রোগটা ছোঁয়াচে রোগ নয়। আর উনি সেরে গেলে তো আর কোন ভয়ই নেই। হ্যাঁ, রোগটা বংশগত ঠিকই, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই সন্তানদের উপর কোন প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। আর একবার রোগী সেরে উঠলে সেই সম্ভবনা আর থাকেনাই বলা চলে। সুতরাং আপনি আপনার স্ত্রীকে একদিন নিয়ে আসুন। আমি ওঁকে দেখতে চাই আগে। তারপর চিকিৎসা শুরু হবে।’

সেই রাতেই বিছানায় দিব্যাকে আদর করতে করতে অনিক পারল কথাটা। খুব ঘনিষ্ঠ অবস্থায় শুয়ে ছিল দুজনে। অনিক দিব্যার মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বলল,’তোমাকে আমি একজন নামকরা স্কিন স্পেশালিষ্টের কাছে নিয়ে যেতে চাই সোনা। তুমি যাবে তো আমার সাথে ?’

চমকে উঠল দিব্যা। গোয়া থেকে ফিরে প্রায় এক সপ্তাহ বাদে আজ এই প্রথম দিব্যার দেহের শ্বেতী রোগের ব্যাপারটা নিয়ে কথা তুলল অনিক। তার মানে ও সেদিন সবই দেখেছে এবং দিব্যার রোগের ব্যাপারে সমব্যাথি হয়ে ওর চিকিৎসার জন্য উদ্যোগ নিয়েছে। মুহূর্তে অনিকের বুকের মাঝে ডুকরে কেঁদে উঠল দিব্যা। একমাত্র ওর মা ছাড়া ওই বাড়িরও কেউ জানেনা যে দিব্যার গায়ে শ্বেতী দেখা গেছে। গত প্রায় ছয় মাস যাবত দিব্যা দুতিন জন হোমিওপ্যাথিক ডাক্তারের ওষুধ খেয়েও দেখেছে। কিন্তু তেমন কোন লাভ হয়নি। আর কিছুটা সেই কারনেই ও এবং ওর মা অনিকরা এদেশি ঘটি পরিবার জেনেও এই বিয়েতে মত দিয়েছিল।

অনিক দিব্যার মনের ব্যাথাটা বেশ অনুধাবন করতে পাড়ছিল। দিব্যাকে শক্ত করে পেঁচিয়ে ওকে আস্বস্থ করবার জন্য বলল,’কেঁদো না দিব্যা। আমি কথা দিচ্ছি, তোমার এই রোগ আমি যেভাবেই হোক সারিয়ে তুলব। আমি একজন বড় স্কিন স্পেশালিষ্টের সাথে আজই কথা বলে এসেছি। উনি তোমাকে নিয়ে যেতে বলেছেন। আমি চাই তুমি পরশু আমার সাথে চল ওনার কাছে। তবে হ্যাঁ, আমি কিন্তু বাড়ির কাউকেই কিছু বলিনি। পরশু আমরা সিনেমা দেখতে যাবার নাম করে বেড়িয়ে যাব। আমি কালই ওনার সাথে এপয়েন্টমেন্ট ফিক্স করে রাখব।’

দিব্যা ভাবতেও পারেনি যে অনিক সব কিছু জেনেও এভাবে রিএক্ট করবে। নিজের প্রতি খুব রাগ হল ওর। কেন প্রথম দিনই অনিকরা যখন ওকে দেখতে গেল তখন একান্তে অনিককে ও বলে দিল না ওর এই রোগের কথা। এখন বিয়ের এতদিন বাদে এসব জেনে অনিক নিশ্চয়ই ওকে একজন ঠগি মেয়েছেলে ভাবছে। ইস, ওর মায়ের পরামর্শে কি ভুলটাই না সেদিন করেছে দিব্যা। সেদিনই যদি এই কথাটা ওকে বলে দিত তাহলে হয়ত অনিকের মনে ওর প্রতি অনেক বেশি সন্মান তৈরি হত এবং ওদের মাঝে কোন লকোছুপি থাকত না। আজ যদিও অনিক পসিটিভ এটিচুড দেখিয়েছে কিন্তু তা সত্বেও দিব্যার মনে হচ্ছিল যে ওর মনে কোথাও না কোথাও একটা দুঃখ থেকেই যাবে, কারণ দিব্যা ওকে এ ব্যাপারে কিছু বলে নি। অনিক নিজেই সব দেখে জানতে পেড়েছে।

দিব্যা ফিস ফিস করে ভেজা গলায় শুধু বলল,’তুমি কেন এতো ভাল অনিক ? আমি তো ভেবেছিলাম এই রোগের কথা জানতে পারলে তুমি খুব রেগে যাবে। সেই ভয়েই আমি তোমাকে এসব বলতে দ্বিধা করছিলাম, বিশ্বাস কর। আমি কিন্তু কখনই তোমাকে ঠকাতে চাইনি গো…।’ অনিক দিব্যার মুখ চেপে ধরে ওকে থামিয়ে দিল। আন্তরিক ভাবে বলল,’তাতে কি হয়েছে দিব্যা ? আমি তো তোমার স্বামী নাকি ? আমি তোমার উপর কি রাগ করতে পারি কখনো ? তোমার একটা রোগ হয়েছে, সেটাকে সারিয়ে তুলতে হবে ব্যাস। তাছাড়া এই রোগটা বিয়ের পরেও তো হতে পাড়ত। তখনও কি আমি তোমার উপর রাগ করতাম ?’

দিব্যা অবাক হয়ে গেল অনিকের কথা শুনে। সত্যি তো। স্বামী স্ত্রীর যে কোন একজনের বিয়ের পড়ে তো অনেক  রকম অসুখ বিশুখ হতেই পারে। তার জন্য কি তাদের সম্পর্ক ভেঙ্গে যায় ? এই সামান্য কথাটা কেন দিব্যার মাথায় আসেনি ? ও শুধু শুধু ভেবে ভেবে অস্থির হয়েছে এই কয়দিন। অথচ আজ কত সিম্পল লজিক দিয়ে অনিক ওকে বুঝিয়ে দিল ব্যাপারটা। অনিকের প্রতি দিব্যার ভালোবাসা ও সন্মান আরও অনেক বেড়ে যায়। দুই হাতে অনিককে পেঁচিয়ে ধরে ওকে চুমুতে চুমুতে ভরিয়ে দিয়ে বলে ‘আই লাভ ইউ অনিক। ইউ আর আ নাইস ম্যান। আমি সত্যি খুশি তোমার মত এরকম একজন উদার মনের মানুষকে স্বামী হিসাবে পেয়ে।’

ডাক্তার মুখারজি দিব্যাকে খুব ভাল করে চেকআপ করলেন। দিব্যা জানাল যে গত পাঁচ ছয়মাস যাবত ও এই শ্বেতী রোগের স্বীকার হয়েছে। এতদিন হোমিওপ্যাথিক ওষুধ খাচ্ছিল। তবে শরীরের আর কোথাও এখনো শ্বেতীর কোন লক্ষন দেখা দেয়নি। ডাক্তার মুখারজি দিব্যাকে দুটো ব্লাড টেস্ট করতে বললেন এবং ঐ রিপোর্ট নিয়ে তিন দিন বাদে আবার ওঁর কাছে যেতে বলে দিলেন। এছাড়া উনি দিবাকে তিনদিনের জন্য কয়েকটা ট্যাবলেট, ও ক্যাপসুল  দিয়ে দিলেন। অনিককে ডাক্তার বললেন,’আপনি ঘাবড়াবেন না মিস্টার লাহিড়ী। ওনার এখন একদম ফার্স্ট স্টেজ চলছে। আমি ব্লাড টেস্ট করে কয়েকটা ওষুধ ও মলম দেব। ওনাকে দুধের তৈরি খাদ্য ও টক জাতীয় খাবার এভয়েড করতে হবে। আশা করছি কয়েক মাসের মধ্যেই সব দাগ মিটে যাবে, নতুন করে দাগও হবেনা।’

দিব্যা ও অনিক ডাক্তার মুখারজির কথায় অনেকটা নিশ্চিন্ত হয়ে বাড়ি ফিরল। দিব্যার মনে অনিকের প্রতি কৃতজ্ঞতা অনেক বেড়ে গেল। এতদিন দিব্যা ভাবত যে ছেলেরা নিশ্চয়ই এইসব রোগকে ঘৃণা করে। ওর স্বামী জানতে পারলে সেও ওকে দুরে ঠেলে দেবে। কিন্তু আজকাল মানুষের মন কত উদার ও আধুনিক মনস্ক হয়ে গেছে সেটা অনিককে না দেখলে কেউ বিশ্বাস করবে না। মানুষটা একবারের জন্যেও দিব্যাকে অবহেলা করেনি বা ওকে ঘৃণায় দুরে সরিয়ে দেয়নি। রোজ রাতে সেই একই ভাবে অনিক দিব্যাকে আদরে আদরে ভরিয়ে দেয়। দিব্যা যেন অন্য সাধারন পাঁচটা মেয়ের মতই একজন,ওর কিছুই হয়নি যেই কারণে ওকে ঘৃণা করতে হবে।

দেখতে দেখতে আরও এক বছর কেটে যায়। অনিকের ব্যাবসা আরও বড় হয়েছে। দিব্যা আসবার পর ওদের পারিবারে সুখ ও সমৃদ্ধি যেন আরও বেড়ে গেছে। শ্বশুর শাশুড়ি দুজনেই দিব্যার আচার ব্যবহার, ওর রান্না বান্না ও গানের গলা শুনে খুশিতে গদ্গদ। ঠিক এরকমই একটা পুত্র বধূ খুঁজছিলেন ওরা। দিব্যা নিজে ওর শ্বশুর শাশুড়ির যথেষ্ট যত্ন আত্তি করে। মাঝে ওরা দুজন ভাগ্নের মুখেভাতে দিল্লিতে বোনের বাড়িতেও ঘুরে এলো।

দিব্যা এখন পুরোপুরি সংসারে জড়িয়ে গেছে। এই কয়েক মাসেই মলম ও ওষুধের গুনে এবং খাওয়া দাওয়ায় যত্ন নেওয়ায় দিব্যার শ্বেতীর দাগগুলি অনেকটা ফিকে হয়ে এসেছে। এছাড়া নতুন করে আর কোন জায়গায় শ্বেতীর লক্ষনও দেখা যায়নি। মাঝে মাঝেই অনিক নিজেই ঘরের দরজা আটকে রাতের বেলা লাইট জ্বালিয়ে দিব্যার বুকে ও পিঠের অবস্থা পরীক্ষা করে দেখে দাগ গুলি কতটা আছে বা কতটা ভাল হয়েছে ওর দিব্যা। স্ত্রীকে যেন অনিক এখন আরও বেশি চোখে হারায়।

অনিকের ওষুধ বিশুধ একই সাথে চলছে। এখন অবধি কোন খারাপ অবস্থা আসেনি। ডাক্তার সেনগুপ্ত এবং অনিকের বাবা মনোরঞ্জন বাবু রিতিমত অনিকের উপর কড়া নজর রেখেছেন। দিব্যা এখনো এটাই জানে যে অনিকের ব্লাড সুগার আছে আর তাই ওকে মাঝে মাঝে ডাক্তারের কাছে চেক আপ করাতে যেতে হয়। দিব্যা অনিকের খাওয়া দাওয়ার ব্যপারে খুব যত্ন নেয়। ওকে তেল ঘি জাতীয় বা ঝাল কোন খাবার একদমই দেয় না। অনিক নিজে বুঝতে পারে যে ওর লাঙের অবস্থা ভাল নয়। তাই সবার কথা শুনেই চলে।

অনিকের এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর বাড়িতে ওর বিবাহ বার্ষিকীর পার্টিতে গিয়ে অনেকদিন বাদে সবাই জোরাজোরি করায় ডিনারের পর অনিক একটা সিগারেট খেল। অনিক সেই রাতে পান মুখে দিয়ে সিগারেটের গন্ধ দুর করে বাড়ি ফিরল ঠিকই কিন্তু সিগারেটের প্রতি ওর পুরানো নেশাটাকে আর মন থেকে দুর করতে পারল না। ঠিক পরদিন অফিসে বসে আবার দুখানা সিগারেট ধংস করল অনিক। কেউ যাতে না বুঝতে পারে তাই রুম স্প্রে দিয়ে গন্ধ ঢাকে এবং অফিসের পুরানো স্টাফ বিশুদাকে শাসায় ও যেন বাবাকে এ ব্যাপারে কিচ্ছু না জানায়। তাহলে কিন্তু তক্ষুনি ওকে চাকরী থেকে বরখাস্ত করা হবে। ভয়ে বিশুদা বড় মালিককে কিছুই জানায় না।

একমাসের মধ্যে অনিক আবার সিগারেটের নেশায় পড়ে গেল। তবে এখন আর দুই প্যাকেট নয়, দিনে এক প্যাকেটের বেশি সিগারেট খায় না অনিক। শরীরটাও তো দেখতে হবে। দিব্যা বা বাবা জানতে পারলে খুব সমস্যা হবে। কিন্তু সিগারেট খাওয়া কিছুতেই বন্ধ করা যাবে না। অনিক অবাক হয় কি করে এতদিন ও সিগারেট না খেয়ে কাটাতে পারল। অসীম ধৈর্য ওর,নাহলে এই আট নয় মাস ও একেবারে নিরামিষ হয়ে ছিল কি ভাবে ? ভাবে পুরুষ মানুষ হয়ে সিগারেট মদ কিছুই খাবে না সেটা হয় নাকি !

লাং কান্সারের রোগীর সিগারেট খাওয়া একবারেই বারণ। যদিও ওষুধ খেয়ে অনিক অনেকটা সুস্থ হয়ে উঠছিল, কিন্তু এই দ্বিতীয়বার সিগারেট ধরায় আবার অনিকের কাশি শুরু হয়। আজকাল প্রায়ই রাতেও ঘুমের সময় খুব কাশতে থাকে অনিক। এরকমই এক রাতে খুব কাশতে কাশতে উঠে বাথরুম চলে যায় অনিক আর দিব্যাও চলে আসে ওর পিছনে। হটাত দিব্যা ওর পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে লক্ষ্য করে বাথ্রুমের বেসিনে অনিকের মুখের কফ ও থুতুর সাথে একটু রক্ত উঠে এসেছে। দিব্যা চমকে ওঠে এবং তাড়াতাড়ি অনিকের মুখে চোখে জলের ঝাপটা দিয়ে ওকে সুস্থ করার চেষ্টা করতে থাকে। একটু বাদেই কাশি কমে গেলে দিব্যা অনিককে ধরে ধরে এনে বিছানায় শুয়ে দেয়। মনে মনে ভাবতে থাকে সুগারের পেসেন্টের গলা দিয়ে রক্ত উঠবে কেন ?

পরদিন দুপুরবেলা দিব্যা কাউকে কিছু না জানিয়ে বন্ধুর বাড়ি যাবার নাম করে ট্যাক্সি নিয়ে সোজা এসে উপস্থিত হয় তালতলার অনিকের অফিসে। লাঞ্চের পড় অনিক তখন অফিসে একাই ছিল আর সিগারেটে সুখ টান দিচ্ছিল। দিব্যা নিচে দারোয়ানকে মুখ বন্ধ রাখতে বলে সিঁড়ি দিয়ে সোজা চলে যায় দোতলায়। দারোয়ান বৌদি মণিকে অফিসে দেখে অবাক হলেও চুপ থাকে। অনিক বা ওর বাবা কাউকেই কোন খবর দেয়না। দিব্যা দোতলায় এসে বারান্দা পার হয়ে দারোয়ানের বলে দেওয়া কেবিনের দরজায় গিয়ে দাঁড়ায়। লক্ষ্য করে ভিতর থেকে সিগারেটের গন্ধ আসছে বাইরে। দিব্যা আসতে করে কাবিনের দরজা ফাঁক করে দেখে অনিক মৌজ করে সিগারেট টানছে আর সামনের ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা পড়ছে।

অনিক একাই বসে আছে দেখে দিব্যা সোজা ঢুকে পড়ল ঘরে। গলাটা পরিষ্কার করে নিয়ে একটু ভারি গলায় বলল,’গুড আফটারনুন মিস্টার লাহিড়ী।’

এভাবে হটাত অফিসে ওর কেবিনে ওরই সামনে দিব্যাকে দেখে ভূত দেখার মত চমকে উঠল অনিক। তাড়াতাড়ি হাতের সিগারেটখানা পিছনের তাকে রাখা এসট্রেতে গুঁজে দিয়ে উঠে দাঁড়াল আর বিস্মিত কণ্ঠে বলল,’আরে, তুমি এখানে দিব্যা ! হটাত একেবারে অফিসে যে, কি ব্যাপার কিছু হয়েছে নাকি ?’

দিব্যা তখনও দাঁড়িয়ে। ঘরটা সিগারেটের ধোঁয়ায় ভরে আছে। দিব্যা কেবিনের দরজাটা খুলে দিয়ে বলল,’কিছু হয়নি তবে এবার হবে। আমি আজই কুরুক্ষত্রের যুদ্ধ লাগাব বাড়িতে। তুমি অফিসে বসে সিগারেট খাবে, রাতে কাশতে কাশতে মুখে রক্ত উঠবে আর আমি চুপ চাপ বসে সেটা দেখব ভাবলে কি করে ?’ দিব্যার চোখে মুখে ফুটে ওঠে বিরক্তি ও ক্রোধের ছায়া। ও বেশ বুঝতে পারে যে মানুষটা আবার কোন কঠিন অসুখ বাধিয়েছে এই সিগারেট খাওয়া ধরবার পড় থেকে। না হলে কই এতদিন তো মুখে কোন রক্ত ওঠে নি ! দিব্যা তো আর জানে না যে অনিকের মুখ দিয়ে কাশির সাথে রক্ত ওঠা নতুন কিছু নয়।

অনিকের মুখ কালো হয়ে গেল। ও বেশ বুঝতে পারল যে সামনে ভয়ঙ্কর বিপদ ওত পেতে দাঁড়িয়ে। আজ ওর নিস্তার নেই। তাড়াতাড়ি টেবিলের ওপাশ থেকে সামনের দিকে চলে এসে দিব্যাকে জড়িয়ে ধরে ওকে শান্ত করার চেষ্টা করতে থাকে। হাসি মুখে বলে,’ও ডার্লিং। তুমি এতো রেগে গেলে হয়। আমি একটু সিগারেট খেয়েছি দেখে এতো রাগ। আরে আমি তো অন্য কোন নেশা করছি না বাবা।’

দিব্যা আরও রেগে ওঠে। এক ঝটকা দিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলে,’যাও আর ন্যাকামো করতে হবে না। আজ আমি বাবাকে আর মাকে গিয়ে সব জানাচ্ছি। রাতে ওরাই তোমার বিচার করবেন। আমি শুধু আমার সন্দেহটা ঠিক কিনা নিজে চোখে সেটা দেখতে এসেছিলাম। আমি এবার চলি, বাড়িতেই বাকি কথা হবে খন।’ কথাটা বলে দিব্যা বেড়িয়ে যাবার জন্য ঘুরে দাঁড়াতেই অনিক ওর পথ আটকে দাঁড়ায়। দুই হাত জোর করে ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গি করে, দুই কান মলে দাঁড়িয়ে বলে,’ক্ষমা চাইছি। প্লিস ফরগিভ মি। আর সিগারেট খাব না দেখো, কথা দিচ্ছি।’

দিব্যা অনিকের কান ধরা দেখে ফিক করে হেসে দেয়। ওর এই ছেলেমানুষি দিব্যার কাছে নতুন নয়। যদি একটু সিরিয়াস কিছু ভুল হয়ে যায় তাহলে অনিক ঠিক এই ভাবেই দিব্যার কাছে ক্ষমা চেয়ে ওকে শান্ত করে দেয়। তবে দিব্যা জানে সেই ভুলটা অনিক আর কোনদিনও করবে না। ও এক কথার মানুষ। কিন্তু সিগারেটের মত মারাত্মক নেশাটাকে হয়ত কোন কারণে এড়াতে পারে নি তাই আবার শুরু করেছে। দিব্যা সামনের চেয়ার টেনে বসল। আর ওকে বসতে দেখে অনিক নিজেও একটা চেয়ার ঘুড়িয়ে দিব্যার সামনে বসে হেস বলল,’থ্যাঙ্ক ইউ দেবী।’

অনিক জানালো ওর বন্ধুর বিবাহ বার্ষিকীর পার্টিতে বন্ধুদের অনুরোধে ও আবার সিগারেট খাওয়া ধরে। তবে আগের মত দুই আড়াই প্যাকেট আর খায় না। দিনে এক প্যাকেটের বেশি সিগারেট অনিক খায় না। আর এই সিগারেট খেয়েই ওর সেই পুরানো কাশি আবার শুরু হয়েছে। কাল ও ডাক্তারের কাছে যাবে চেক আপ করতে। দিব্যা যেন একদম চিন্তা না করে। দিব্যা অনিকের অফিসে এক কাপ কফি খেয়ে বাড়ি ফিরে আসে। অনিকই একটা গাড়ি দিয়ে ওকে বাড়ি পাঠিয়ে দেয়। রাতে দিব্যা অভিমানে অনিককে কাছেই ঘেষতে দিলো না। শর্ত রেখেছে আগে অনিক ডাক্তারের কাছে গিয়ে চেক আপ করাবে ও ওষুধ নিয়ে আসবে, তারপর যেন দিব্যাকে ও ছোঁয়। তার আগে নৈব নৈব চ। বেচারা অনিক অনেক কষ্টে দিব্যাকে রাজি করে যাতে অন্তত ও দিব্যাকে পেঁচিয়ে শুতে পারে। না হলে ও ঘুমতে পাড়বে না।

দিব্যা শ্বশুর শাশুড়িকে কিছুই জানায় নি এখনো। পরদিন অফিস যাবার সময় অনিক কথা দিয়ে যায় যে ও আজ অফিস থেকে তাড়াতাড়ি বেড়িয়ে ডাক্তার সেনের সাথে দেখা করে চেক আপ করিয়ে ফিরবে। দিব্যা দুপুরে বাড়ি যখন শান্ত, ছাঁতে গিয়ে ওর বাবাকে ফোন করল। বাবাকে জানাল যে অনিকের সুগারের প্রব্লেম আছে এবং ও রেগুলার তার জন্য ওষুধ খাচ্ছে। কিন্তু পরশু রাতে কাশতে কাশতে অনিকের গলা দিয়ে থুতুর সাথে রক্ত বেড় হয়েছে। দিব্যা বাবাকে জানায় যে অনিক মাঝে সিগারেট ছেড়ে দিয়েছিল কিন্তু কয়েক সপ্তাহ হল আবার ধরেছে সেটা। ফলে ওর শরীর বোধহয় আরও খারাপ হয়েছে আর তাই ডাক্তার দেখিয়ে বাড়ি ফিরবে।

দিব্যার বাবা তখন অফিসে ছিলেন। মেয়ের মুখে জামাইয়ের মুখ দিয়ে রক্ত উঠেছে শুনেই চিন্তায় পড়ে গেলেন। সুগারের রোগীর মুখ দিয়ে রক্ত বেড় হবার তো কথা নয়। অনিকের মধ্যে নিশ্চয়ই কোন কঠিন রোগ আছে যেটা দিব্যা জানেনা বা অনিকরা চেপে গেছে। উনি খুব চিন্তায় পড়ে গেলেন। মেয়েকে বলে দিলেন অনিকের ওষুধ গুলির নাম ওঁকে হোয়াটস এপ করে দিতে আর রাতে অনিক ঘুমিয়ে পড়লে ওর মেডিকেল ফাইলটা খুলে ওর রিপোর্টগুলি সেল ফোনে ফটো তুলে ওঁকে পোষ্ট করে দিতে। দিব্যা জানে অনিকের মেডিকেল ফাইল ওদের আলমারিতে তোলা থাকে, কিন্তু ও কোনদিন খুলে দেখেনি সেটা। বাবাকে জানিয়ে দিল ও সব পাঠিয়ে দেবে।

অনিক ফিরল রাত নটা নাগাদ। খাবার টেবিলে বাবা জিজ্ঞাসা করলেন,’কিরে আজ শুনলাম তোর আবার কাশি শুরু হয়েছে। কি শরীর ঠিক আছে তো নাকি ?’

অনিক চমকে উঠে তাকায় দিব্যার দিকে। ও ভাবে দিব্যাই হয়ত বাবাকে কিছু বলেছে। কিন্তু দিব্যা ইশারায় জানায় ও বাবাকে কিছুই জানায় নি। অনিক তখন বুঝতে পারে যে বাবা অফিসেই হয়ত ওকে কাশতে শুনেছেন বা কেউ বলেছে বাবাকে। অনিক বাবাকে সান্ত্বনা দেয় আর বলে ‘ঐ একটু ঠাণ্ডা লেগেছে হয়ত। ও ঠিক হয়ে যাবে। তুমি একদম চিন্তা করবে না। আমি ঠিক আছি বাবা।’

অনিক বাবাকে মিথ্যা আশ্বাস দিলেও দিব্যাকে সত্যি কথা না বলে পারল না। রাতে বিছনায় শুয়ে দিব্যার কাছে অনিক স্বীকার করল সব। বলল,’ডাক্তার সেন গুপ্ত আজ আমাকে খুব বকাবকি করেছেন ও সিগারেট একদম ছেড়ে দিতে বলেছেন। আমার নাকি লাং ক্যান্সার ধরা পড়েছে। একদম ফার্স্ট স্টেজ, ঠিকমত চিকিৎসা হলে এবং খাওয়া দাওয়া সাবধানে করতে পারলে ভাল হয়ে যাবার চান্স আছে। উনি নাকি বাবাকে অনেক আগেই জানিয়েছিলেন সেটা, বাবা কিন্তু আমাকে কিছুই জানায়নি জানো। বিশ্বাস কর, আমাকে বাবা বলেছিলেন যে আমার নাকি ব্লাড টেস্ট করে হাই ব্লাড সুগার ধরা পড়েছে, তাই আমি ডাক্তারের পরামর্শে বাবার কথায় সিগারেট খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলাম। আজ আমার লাং কান্সারের কথা শুনে আমি থ হয়ে গেছি দিব্যা।’

দিব্যা লক্ষ্য করল কথাগুলি বলতে গিয়ে অনিকের চোখদুটো ছল ছল করছে। দিব্যা ওর বাবা আজ দুপুরে অনিকের ওষুধের নাম জানতে চেয়ে এবং ওর রিপোর্টের কপি চেয়ে পাঠানোতে একটু অবাক হয়ে গিয়েছিল। এবার বেশ বুঝতে পারল বাবা ঠিক সন্দেহ করেছেন, অনিকের মুখ দিয়ে রক্ত উঠেছে ওর ভিতরে কান্সারের মত মারাত্মক রোগ বাসা বেধেছে তাই, নতুবা সুগারের কেস হলে সেটা হতো না। অনিকের চোখে জল দেখে দিব্যার বুক ফেটে কান্না চলে এলো। চোখের জলকে বেঁধে রাখবার আপ্রাণ চেষ্টা করেও পারল না দিব্যা। অনিকের মাথাটা ওর বুকের মাঝে চেপে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল দিব্যা। দুজনেই দুজনকে ধরে কেঁদে ভগবানের কাছে ওঁদের মনের হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করছে যেন। এ ছাড়া কি বা আর করতে পারে ওরা দুই হতভাগ্য মানুষ।

দিব্যার শ্বেতী রোগ ভাল হয়ে আসবার মুখে হটাত নিজের এই মরণ রোগের খবরে দিব্যার চেয়েও বেশি ভেঙ্গে পড়ল অনিক। ঠাকুর কেন ওকে এই শাস্তি দিলেন ? কই ও তো কোনদিন কারো কোন ক্ষতি করেনি। ওতো সব সময় মানুষের দুঃখে কষ্টে তার পাশে দাঁড়িয়ে তাকে সাহায্য করবার চেষ্টা করে গেছে। তাহলে ভগবানের কাছে কি তার কোন মুল্য নেই ? মানুষের কষ্টে তার পাশে দাঁড়ানো আরেকজন মানুষকে ঠাকুর কেন এতো কষ্ট দেন ? কই যারা অন্যের ক্ষতি করে, চুরি করে, অপরাধ করে তারা তো দিব্যি হেসেখেলে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ভগবান ভাল মানুষদের সাথে কেন এই ব্যবহার করেন ?

অনিক ভেঙ্গে পড়লেও দিব্যা কিন্তু শক্ত হাতে সামলে নিল নিজেকে ও সাহস জোগাল অনিককে। দুই হাতে অনিকের মুখ তুলে ধরে বলল,’তুমি যদি আমাকে সত্যিকারের ভালোবাস তাহলে আজ এই মুহূর্তে কথা দাও যে তুমি আজ থেকে আর কোনদিন সিগারেট ছোবেও না। সে যতই বন্ধুরা বলুক তোমায়। ক্ষতিটা কিন্তু তোমারই হচ্ছে ,ওদের হচ্ছে না অনিক। আমি তোমার বাবা মাকে এখনো কিছুই জানাই নি। তবে তুমি যদি আমার কথা না শোন তবে আমি বাবা মাকে সব জানাব আর বাপের বাড়ি চলে যাব, এই আমি বলে দিলাম।’ দিব্যার মুখে ফুটে উঠল এক কঠিন ভাব। অনিক ভয় পেয়ে ওর বুকে মুখ গুঁজে ফিসফিস করে বলল,’আচ্ছা,কথা দিলাম।’

অনিক ওর কথা রেখেছে। ও আর সিগারেট খায়নি এবং নিজেকে সব ব্যাপারে সংযত করে নিয়েছে। দিব্যা বাপের বাড়ি চলে যাবে বলায় অনিকের বিশ্বাসের ভিত কেঁপে উঠেছে। সিগারেট কেন, অনিক চাইলে সব কিছু ত্যাগ দেবে কিন্তু দিব্যাকে ও কিছুতেই ছাড়তে পাড়বে না। দিব্যা ওর প্রাণ ভোমরা ,ওর জীবনের এক আশীর্বাদ। সারাদিন কাজকর্ম সেরে বাড়ি ফিরে দিব্যার কোলে মাথা রেখে শুয়ে ও যা আনন্দ পায় সেই সুখ কেউ ওকে দিতে পারবে না। মনে হয় যেন এক ভোরের শিশির ভেজা ঘাসের বিছানায় ফেলে দিয়েছে ওর ক্লান্ত শরীরটা।

দিব্যা ওর বাবাকে কিছুই পাঠাল না। অনিক ওকে কোন মিথ্যা কথা বলেনি। তাহলে কেন ও বাবাকে ওর বিরুদ্ধে বলতে যাবে। অনিককে দিব্যা ভালোবাসে, ওর স্বামীর ভালোবাসায় ও একজন নারীর পূর্ণতা লাভ করেছে। আজ ওর বর্তমান ভবিষ্যৎ সবই তো অনিক। ওকে ছাড়া দিব্যা বাঁচবে কি করে। অনিকের বাবা যেমন ওদেরকে কিছু জানান নি তেমন ওরাও তো অনিকদের ওর শ্বেতী রোগের ব্যাপারে কিছুই জানায় নি। আর তাছাড়া এক্ষেত্রে যদি বিচার করা যায় তাহলে দিব্যা অনেক বেশি দোষী কারন ও ওর নিজের রোগটা জানত, কিন্তু অনিক কয়েকদিন আগে পর্যন্ত ওর এই সাংঘাতিক রোগের কথা জানতো না। দিব্যা এখন হাত কামড়াচ্ছে কেন ও সেদিন এতো ভয় পেয়ে গেল আর বাবাকে ফোন করে সব জানিয়ে দিল ?

ওদিকে দিব্যার বাবা বেশ কয়েকবার ফোন করেও দিব্যার কাছ থেকে আর কোন খবর না পেয়ে খুব চিন্তায় পড়ে গেলেন। দিব্যা কেন হটাত চুপ করে গেল আর কেনই বা ‘হ্যাঁ পাঠাচ্ছি,পাঠাব’ করে সময় নষ্ট করছে ওঁর মাথায় ঢুকল না। এভাবে মাস খানেক চলে যাবার পড় একদিন উনি মনোরঞ্জন বাবুকে ফোন করে খবরাখবর সব জেনে মেয়েকে কয়েকদিনের জন্য বাপের বাড়িতে পাঠাবার অনুরোধ জানালেন। বেয়াই মেয়েকে তার বাড়িতে পাঠাতে বলেছেন শুনে তক্ষুনি উনি রাজি হয়ে গেলেন ও বাড়িতে ফিরে রাতেই অনিককে বললেন পরদিনই অফিস যাবার আগে বৌমাকে বাপের বাড়িতে ড্রপ করে দিয়ে আসতে, ঘুরে আসুক ও কয়েকদিনের জন্য।

বাবা ওকে পাঠাতে বলেছে শুনেই বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠল দিব্যার। ও বেশ বুঝতে পারে যে বাবা কেন ওকে ও বাড়িতে গিয়ে থেকে আসতে অনুরোধ করেছে শ্বশুরের কাছে। উনি নিশ্চয়ই ওকে বাড়িতে ডেকে নিয়ে গিয়ে চেপে ধরবেন। আর একবার ঐ বাড়িতে গিয়ে পড়লে দিব্যার আর পালাবার কোন জায়গা থাকবে না। অনিকের আসলে ঠিক কি অসুখ হয়েছে, অনিক এখন কেমন আছে, ডাক্তার বাবু কি বলেছেন এই সব প্রশ্নবাণে বাবার কাছে ওকে জর্জরিত হতে হবে। খাওয়া দাওয়া সেরে ঘরে গিয়ে গুম মেরে খাটে শুয়ে পড়ল দিব্যা।

অনিক ঘরে এসে ওর প্রাণভোমরা মুখ ভার করে আছে দেখে অবাক। জিজ্ঞাসা করল,’কি ব্যাপার, শুনেছি মেয়েরা বাপের বাড়ি যাবার নাম শুনলে নেচে ওঠে। কিন্তু আমার ভোমরা এমন মুখ ভার করে আছে কেন দেখি।’ বলেই পাশে শুয়ে দিব্যার মুখ তুলে ধরে অনিক। দিব্যার চোখে জল। অনিক ঘাবড়ে যায়। আন্তরিক ভাবে দিব্যার ঠোঁটে ঠোঁট ছুঁয়ে জিজ্ঞাসা করে,’কি হয়েছে দিব্যা ?তোমার চোখে জল কেন ? কেন কাঁদছ তুমি সোনা ?’

দিব্যা অনিকের বুকে মুখ গুঁজে বলে ওঠে,’আমি তোমাকে ছেড়ে কোথাও যেতে চাইনা অনিক। তুমি যদি কাল আমাকে নিয়ে যাও তবে আবার তোমার সাথে করে নিয়ে আসতে হবে। বাবা মাকে দেখেই আমি চলে আসব। কিছুতেই তোমাকে ছাড়া আমি থাকতে পারব না।’ অভিমানি আদুরে গলায় কথাটা বলে অনিককে সাপের মত পেঁচিয়ে ধরে দিব্যা। মনে হয় এক্ষুনি যেন কেউ ওকে অনিকের হাত ছাড়িয়ে দুরে কোথাও নিয়ে যেতে চাইছে। অনিক হেসে ফেলল আর বলল,’ধ্যুর পাগলী। সেটা আবার হয় নাকি। তোমার বাবা নিজে বাবাকে ফোন করে কয়েক দিনের জন্য তোমাকে ও বাড়িতে পাঠাতে বলেছেন। সেখানে আমি তোমাকে ফিরিয়ে আনি কি ভাবে?’

দিব্যা অনিককে কিছুতেই রাজি করাতে পারল না। ওর একটুও ইচ্ছা হচ্ছিল না কাল বাপের বাড়ি যেতে। কিন্তু শ্বশুরের আদেশ অমান্য করবার সাহস ওর বা অনিকের কারো নেই। বাধ্য হয়ে একটা ব্যাগে দু’চারদিনের শাড়ি কাপড় ভরে সকালে টিফিন খেয়ে খড়দার উদ্দেশ্য বেড়িয়ে পড়ল অনিক আর দিব্যা। অনিক বাবাকে জানায় ও দিব্যাকে ওর বাপের বাড়িতে ছেড়ে দিয়ে সোজা তালতলায় অফিসে চলে আসবে। তার আগে যাদের ওর সাথে দেখা করার কথা আছে বাবা যেন তাদের সাথে কথাবার্তা সেরে নেন।

দিব্যার বাবা তখন বাড়িতে ছিলেন না। মেয়ে আসবে জেনেও অফিস গেছেন ঠিকই , কিন্তু তাড়াতাড়ি ফিরেও আসবেন এবং সাথে তিন দিনের ছুটিও নিয়ে নেবেন। দিব্যার মা বৌদিরা সবাই অনিককে বারবার দুপুরের লাঞ্চ সেরে যেতে বলল। কিন্তু অনিক চা জলখাবার খেয়েই ফিরে গেল কলকাতায়। দিব্যাও তেমন জোর দেখাল না। অবশ্য দিব্যা আজ চাইছিল যত তাড়াতাড়ি সম্ভব অনিক ফিরে যাক, অন্তত বাবা বাড়ি ফিরে আসবার আগে। বাবা একবার অনিককে হাতের কাছে পেলে যে কি কি সব প্রশ্ন করবে সেটা ভেবেই ওর গায়ে জ্বর আসছে যেন। দিব্যার যদিও ওর মায়ের মুখ চোখ দেখে মনে হলনা যে বাবা মাকে কিছু বলেছেন।

অনিক চলে যাবার সময় শাশুড়িকে প্রনাম করে বলে গেল যে চারদিন বাদে রবিবার বিকেলে এসে ও দিব্যাকে নিয়ে যাবে। শাশুড়ি ওকে বলেছিলেন সকালে এসে দুপুরের লাঞ্চ সেরে তারপর ফিরতে। কিন্তু অনিক রাজি হয়নি। সেদিন সকালে নাকি ওর বেহালায় এক বড় পার্টির সাথে এপয়েন্টমেন্ট ফিক্স করা আছে। ও বিকেলেই আসবে আর সন্ধ্যার আগেই রওনা দেবে। বৌদিরা বলেছিল অন্তত রাতের খাবার খেয়ে যেতে। কিন্তু অনিক তাতেও রাজি হয়নি। দিব্যা মনে মনে খুশি হল যে অনিক ওদের বাড়ি বেশিক্ষণ থাকতে চাইছে না, একদিক দিয়ে ভালই হল। বাবা কোন সুযোগই পাবেনা ওকে প্রশ্নবাণে বিদ্ধ করতে। দিব্যা চায় এখনই অনিকের ক্যান্সার রোগ নিয়ে বাড়িতে কোন আলোচনা না করতে। অনিক যে ওর এই রোগের জন্যই সব এভয়েড করছে সেটা ও জানে।

সারাদিন বৌদিদের সাথে গোয়া ট্যুরের গল্প,মার সাথে শ্বশুরবাড়ির সবাই কে কেমন ইত্যাদি সব আলোচনা করে দিনটা কেটে গেল। বিকেলের দিকে বাবা বাড়ি ফিরে সবার সামনে মেয়েকে বেশ ভাল ভাল কথা বলে ওরা সব কেমন আছে, জামাই কেন খেয়ে গেল না ইত্যাদি জিজ্ঞাসা করে স্বাভাবিক আচরন করলেন। কিন্তু রাতে খাওয়া দাওয়া সেরে ওর ঘরে এসে খাটে বসবার পড়েই দিব্যা দেখে বাবা এসে দরজা ভেজিয়ে দিয়ে ওর পাশে বসলেন। দিব্যা জানে এবারই বাবা তার অনুসন্ধান শুরু করবেন। রিপোর্টে কি বলেছে, অনিকের রোগের লক্ষন গুলি কি, ও কি খেতে ভালবাসে বা কি খেতে চায়না, কি কি ওষুধ খাচ্ছে ইত্যাদি ইত্যাদি।

ঠিক সেটাই করলেন রঘুনাথ বাবু। উদগ্রীব হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন,’কি রে মা। তোকে যে এতোবার বললাম সব জানাতে, তুই তো কিছুই জানালি না আর। অনিকের নাকি সুগার হয়েছে বললি আবার কাশতে কাশতে রক্ত বেড় হচ্ছে বললি। আসলে কি হয়েছেটা কি ওর ? কি,কোন সিরিয়াস কিছু নাকি ? আমি কিন্তু খুব চিন্তায় আছিরে মা।’

দিব্যা জানে বাবার কাছে এসব জিনিষ বেশিদিন লুকিয়ে রাখা সম্ভব না। ও আগে থেকেই ভেবে এসেছে বাবা মাকে অনিকের রোগের ব্যাপারটা এবার জানিয়েই দেবে। শত হলেও ওনাদের অন্ধকারে রাখা যাবে না। একদিন না একদিন যখন সব জানবেন ওরা তখন খুব দুঃখ পাবেন আর দিব্যাকে ভুল বুঝবেন। অনিক এখন ভীষণ ভাবে নিজেকে বদলাবার চেষ্টা করছে। দিব্যার মাথায় হাত রেখে কসম খেয়েছে যে ও আর কোনদিন সিগারেট ছোঁবেও না। এখন বাবা যখন অর্ধেক সত্য জেনে গেছেন তখন উনি সহজে আর ওকে বিশ্বাস করবেন না। বরং মিথ্যা কথা বলতে গিয়ে উল্টে ফল হবে। তার চেয়ে সব কথা বলে দেওয়াই ভাল।

দিব্যা বাবার দিকে তাকিয়ে বলল,’তুমি যেটা ভাবছ সেটাই সত্যি। অনিকের লাং ক্যান্সার ধরা পড়েছে বাবা। যদিও এখন মাত্র ফার্স্ট স্টেজ। ট্রিটমেন্ট শুরু হয়ে গেছে। মাঝে ও কয়দিন বন্ধুদের প্ররোচনায় সিগ্রেট খেয়েছে আর তার ফলে কাশি শুরু হয় ও মুখে রক্ত চলে আসে। তুমি চিন্তা করবে না। ও ঠিক হয়ে যাবে বাবা।’

ইনকাম ট্যাক্সের দুঁদে অফিসার মিস্টার রঘুনাথ সেনগুপ্ত যেন আকাশ থেকে পড়লেন। কোন একজন ক্লাইন্ট তার সঠিক রোজগার ডিক্লেয়ার না করলেও বোধ হয় উনি এতটা অবাক হতেন না যতটা অনিক বা তার বাবা মা কেউই ওর ক্যান্সার আছে সেটা দিব্যার সাথে বিয়ের আগে ডিক্লেয়ার করেন নি তা জানতে পেরে। দিব্যা ওদের একমাত্র মেয়ে। তার সাথে কিনা বিয়ে হল একজন কান্সারের রোগীর সাথে। এত বড় ধোঁকা, এতোবড় বেইমানি ? দিব্যা কি জলে পড়ে গেছিল যে ওকে অনিকের মত এক অসুস্থ পাত্রর সাথে বিয়ে দিতে হবে ?এই অন্যায় কিছুতেই মেনে নেওয়া যায়না। ভদ্রলোকের চোখ মুখ রাগে লাল হয়ে গেল। চিৎকার করে বলে উঠলেন ‘কি বলছিস কি তুই মা। আমি তো নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছি না।’

দিব্যা বাবাকে রেগে যেতে দেখে ঘাবড়ে গেল। তাড়াতাড়ি বাবার হাত ধরে ফিসফিস করে বলল,’বাবা, তুমি ছাড়া আর কেউ জানে না। আমি মাকেও বলিনি এসব। একটু চুপ কর তুমি, শান্ত হও বাবা।’

‘শান্ত হব মানে। ইয়ার্কি নাকি ? একটা অচল ছেলেকে আমার মেয়ের সাথে বিয়ে দিয়ে গছিয়ে দিল ওরা আর আমি শান্ত হয়ে ঘরে বসে থাকব বলছিস। ডাক তোর মাকে ডেকে আন এক্ষুনি। আজ আমি এর একটা হেস্ত নেস্ত করে ছাড়ব বলে দিচ্ছি। ডাক তোর মাকে।’ গলাটা একটু নামিয়ে কড়া ভাবে বলে উঠলেন রঘুনাথ বাবু। দিব্যা ভয়ে তাড়াতাড়ি ঘর ছেড়ে বাড়িয়ে পাশের ঘর থেকে ডেকে আনল ওর মা নমিতা দেবীকে। মাকে এখনো কিছুই জানায় নি দিব্যা। জানে মাও এখন খুব রেগে যাবে আর ওকে বকা বকি করবে। দিব্যা ভয়ে শুকিয়ে যেন কাঠ হয়ে যাবে এবার। কি হবে এখন ?

নমিতা দেবী মেয়েকে হটাত এভাবে ডেকে নিয়ে যেতে দেখেই বুঝতে পাড়লেন বড় একটা গণ্ডগোল বেঁধেছে। সকালে জামাই না খেয়ে চলে গেল, আবার রবিবারও খেতে পাড়বে না বলে গেল। আর এখন ওঁর স্বামী মেয়ের উপর রাগারাগি করছেন পাশের ঘর থেকেই উনি স্বামীর চিৎকার শুনতে পেয়েছিলেন। দিব্যার ঘরে ঢুকেই উনি আগে দরজাটা ভিতর থেকে আটকে দিয়ে রঘুনাথ বাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘একটু আস্তে কথা বলবে তো। আমি পাশের ঘর থেকে তোমার আওয়াজ পেয়েছি। আস্তে কথা বল, কি হয়েছে শুনি। আগেই অতো রাগারাগি না করে আগে শুনি কি হয়েছে, কেন তুমি এতো রেগে গেলে হটাত।’

ফোঁস করে উঠলেন রঘুনাথ সেনগুপ্ত। ‘ রাগ করবো না বলছ। কি হয়েছে জানো তুমি, শুনবে ? তোমার মেয়েকে , না শুধু মেয়েকে কেন ,আমাদের সবাইকে বিরাট ভাবে ঠকিয়েছে ঐ মনোরঞ্জন লাহিড়ী আর তার বৌ ও ছেলে। ওরা ভেবেছিল কেউ কিছু জানতে পাড়বে না, ছেলেটার বিয়ে চুপচুপ করে হয়ে যাবে ?’

‘আরে হয়েছে কি সেটা বলবে তো। কি করেছে ওরা যে তুমি ওঁদের ঠগ জোচ্চর বানিয়ে দিলে ?’ রেগে যান নমিতা দেবী। স্বামীর এই একটা বদ অভ্যাস। সোজা কথা সোজা ভাবে বলতে পারেননা, বেঁকিয়ে টেরিয়ে বলবেন। ওঁর এই অর্ধেক কথায় কি বুঝবেন উনি ?

‘কি হয়েছে মানে ? অনিকের নাকি লাং ক্যান্সার ধরা পড়েছে। আমাদের দিব্যাটার কপালে শেষে কিনা এমন একটা পাত্র এসে জুটল ? ইস কি ব্লাণ্ডার করেছি ভাল করে খোঁজ খবর না নিয়ে। কোন কুক্ষনে যে ঐ অসুস্থ ছেলেটার হাতে আমার দিব্যা মাকে তুলে দিতে গেলাম , হায় ভগবান…।’  দুই হাতে মাথার চল টেনে বসে রইলেন রঘুনাথ সেনগুপ্ত। মেয়ের মুখের দিকে তাকাতেও লজ্জা হচ্ছে যেন। আর নমিতা দেবী অনিকের ক্যান্সার ধরা পড়েছে শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। তাহলে ভগবান কি ওঁকে এইভাবেই শাস্তি দিতে চেয়েছেন ?

দিব্যার দিকে তাকিয়ে দেখলেন ও মুখ নিচু করে বসে আঁচলের খোটা বাধছে আর খুলছে। বোঝাই যাচ্ছে মেয়ের চোখে জল। দুই এক ফোঁটা গালের পাশ দিয়ে গড়িয়ে পড়েছে। মায়ের মন বলে কথা, মিনতি দেবীর মনটা হু হু করে উঠল। ওঁর ভুলের শাস্তি মেয়েটা পাবে সেটা উনি প্রথমে মানতে পাড়লেন না। দিব্যার কাঁধে হাত রেখে সস্নেহে জিজ্ঞাসা করলেন,’কিরে মা। সত্যি কি ক্যান্সার না কি অন্য কোন রোগ ধরা পড়েছে ওর ? তুই কি শিওর নাকি আন্দাজে বলছিস এসব ?’

‘না মা। অনিক নিজেই আমার কাছে সব খুলে বলেছে। ও আগে ক্যান্সার হয়েছে জানত না। বাবা নাকি ওকে বলেছিলেন যে ওর ব্লাড সুগার হয়েছে, সিগারেট বা তেল ঘিয়ের খাবার খাওয়া একদম বারণ।’ দিব্যা বলল।

রঘুনাথ বাবু এবার নিচু কিন্তু দৃঢ় গলায় বলে উঠলেন,’আমি কিছুতেই আমার মেয়েকে আর ঐ বাড়িতে পাঠাব না। আমি কোর্টে কেস করব, ওঁদের বিরুদ্ধে মামলা করব, ক্ষতিপূরণ চাইব। ছেলের ক্যান্সার জেনেও কি ভাবে ওরা ওঁদের ছেলের সাথে আমাদের মেয়ের বিয়ে দিলেন। এটা কি মগের মুলুক নাকি ? দেশে আইন কানুন কিছু নেই? যা খুশি তাই করলেই হল ? কত বড় শয়তান এরা, আমাদের একবারও জানালো না ! এমন কি দিব্যার সাথে আলাদা করে কথা বলার সময় অনিক নিজেও কিছু জানায় নি ! ওর সুগারের কথা তো পড়ে বলেছে। আর সেটাও যে একটা মিথ্যা কথা সেটা তো এখন বেশ বোঝা যাচ্ছে। না না আমি ওঁদের ছাড়ব না।’

বাবা ওকে আর ঐ বাড়িতে পাঠাবে না শুনেই দিব্যা হাউ হাউ করে মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল। নমিতা দেবী ইশারায় স্বামীকে থামতে বলে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন,’শোন মা, কাঁদিস না। সব ঠিক হয়ে যাবে। মাথার উপরে ভগবান আছেন। দেখিস উনি ঠিক তোর মঙ্গল করবেন মা। আমি দেখছি সব।’ কথা গুলি বলে উনি রঘুনাথ বাবুর দিকে তাকিয়ে ধমকের সুরে বলে উঠলেন,’তুমি আগ বাড়িয়ে এসব কথা আনছ কেন বলতো ? দিব্যা ও বাড়িতে যাবে না বললেই হল। ওটা ওর শ্বশুর বাড়ি, ওর বর রয়েছে ওখানে।’

‘কিসের শ্বশুর বাড়ি ? যারা একটা সত্যিকে চেপে রেখে এই ভাবে একটা ভদ্র পরিবারের সাথে বিয়ের মত পবিত্র একটা সম্পর্ক বাঁধতে পারে তারা কত নিচ একবার ভাব তো। কি দোষ করেছে দিব্যা ? কেন ওকে ঐ ছেলেটার এই কঠিন অসুখের ফল ভুগতে হবে ? ওর সামনে এখনো সারাটা জীবন পড়ে আছে সেটা ভেবে দেখেছ ? আমি কিছুতেই এই অন্যায়ের সাথে আপোষ করতে পারব না।’ রঘুনাথ বাবুর চোখ দিয়ে তখনও আগুন ঝড়ছে যেন।

নমিতা দেবী স্বামীর কথার কোন জবাব না দিয়ে মেয়ের কানের কাছে মুখ এনে নিচু গলায় জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আর তোর ব্যাপারটা কি জানতে পেড়েছে অনিক ?’

দিব্যা মাথা নাড়িয়ে ফিস ফিস করে বলল,’হ্যাঁ মা। ও জানতে পেরেই আমাকে ডাক্তার দেখিয়েছে ও তার ওষুধ খেয়ে ও মলম লাগিয়ে এখন আমি অনেকটা ভাল হয়ে উঠছি মা। তোমাদের জামাইয়ের এই ব্যাপারে দেখলাম কোন রকমের রাগ বা অভিমান হয়নি। উল্টে আমাকে বলেছে আমি যেন একদম ভেঙ্গে না পড়ি, ও সব সময় আমার পাশে থাকবে। অনিকের মত ছেলে আমি আর দেখিনি মা, ও ভীষণ ভদ্র ও ভাল ছেলে। আমি ওকে খুব ভালোবাসি মা। আমি অনিককে ছাড়া থাকতে পারব না। আমাকে শ্বশুর বাড়িতে যেতে দাও মা…।’ বলতে বলতে আবার কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল দিব্যা।

মিনতি দেবী বুঝলেন বিয়ের পড় স্ত্রীর শ্বেতী রোগের কথা জেনেও যদি একটা পুরুষ মানুষ এতোটা সহমর্মিতা দেখাতে পারে তাহলে সে নিশ্চয়ই একজন সৎ ও অত্যন্ত ভাল মানুষ। মনে মনে ঠাকুরকে ধন্যবাদ দিলেন যে উনি দিব্যাকে অনিকের মত একটা সৎ ছেলে পাইয়ে দিয়েছেন যে ওকে ভালোবাসা দিয়ে ভরিয়ে রেখেছে। কিন্তু তারপরেই ওঁর মনে হল অনিকের ক্যান্সার হয়েছে। ওকে যেভাবেই হোক সেবা শুস্রসা করে ভাল করে তুলতে হবে। আর সেটা করতে পারে একমাত্র দিব্যা এবং ওর ভালোবাসা। দিব্যাকে কোনমতেই অনিকের কাছ থেকে আলাদা করা যাবে না। এতে না অনিক ভাল থাকবে আর না দিব্যা সেটা মেনে নিতে পাড়বে। ভগবানের যদি ইচ্ছা হয় উনি সব কিছু ঠিক করে দেবেন। নাহলে দিব্যাই বা কিভাবে ভাল হয়ে যাচ্ছে ?

রঘুনাথ বাবু স্ত্রীকে ফিস ফিস করে মেয়ের সাথে কথা বলতে শুনে রেগে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন,’কি তোমরা কি অনিক বা ওর পরিবারকে ছেড়ে দেবার প্ল্যান করছ নাকি ? একটা এতো বড় সত্যি লুকিয়ে ছেলের বিয়ে দিয়েছে ঐ মনোরঞ্জন লাহিড়ী, আমি কিন্তু তাকে কিছুতেই ছাড়ব না বলে দিলাম। একটা অসুস্থ ছেলের সাথে সারাজীবন ঘর করবে না দিব্যা। আমি ওকে দিয়ে ডিভোর্স করিয়ে আবার মেয়ের বিয়ে দেব।’

‘দয়া করে তুমি থামবে একটু ?’ কড়া গলায় ধমকে উঠলেন নমিতা দেবী। আর তারপরেই বলে ফেললেন,’তুমি যে ওঁদের বারবার সত্য লুকিয়ে বিয়ে দিয়েছ বলে গালাগাল করছ,আমরা কি করেছি ? আমরাও তো সেই একই কাজ করেছি। আমরা কোন ধোয়া তুলসী পাতা ? তুমি তো সব জাননা তাই এসব বলে চলেছ।’

রঘুনাথ বাবু কিছু বুঝতে না পেরে ফ্যালফ্যাল করে স্ত্রী আর মেয়েকে দেখতে থাকলেন। এক মুহূর্ত চুপ করেই জিজ্ঞাসা করলেন,’কেন, আমরা আবার কি অন্যায় করেছি। আমার মেয়েকে ওরা দেখে শুনে নিয়ে গেছে। আমরা তো কোন কিছু লুকই নি ওদের মত।’

‘হ্যাঁ ঠিকই বলেছ। দেখে শুনেই নিয়ে গেছে বটে। কিন্তু যেটা দেখতে পায়নি, বা যেটার ব্যাপারে বিয়ের আগে আমি বা দিব্যা ওঁদের কিছুই জানাই নি সেটা ? সেই ভাবে দেখলে আমরাও তো অন্যায় করেছি তাই না ?’

রঘুনাথ বাবুর সাথে থাকতে থাকতে নমিতা দেবিও কিছুটা হেঁয়ালি করে কথা বলতে শিখে গেছেন। কিন্তু রঘুনাথ বাবু তখনও পর্যন্ত কিছু বুঝতে পারছেন না দেখে আবার জিজ্ঞাসা করলেন,’ফালতু কথা ছাড়ো তো। আসল কথাটা বল। আমরা আবার কোন কথা লুকলাম ? আমরা তো সবই বলেছি ওঁদের।’

‘না বলিনি। তুমি কি জানো তোমার মেয়ের শরীরে শ্বেতী রোগ ধরেছে ? ওঁর বুকে আর পিঠে দুই জায়গায় সেটা বিশ্রী ভাবে ফুটে উঠেছে। এই কথা জানতে পারলে কি কোন পাত্রের বাবা তাদের ছেলের সাথে দিব্যার বিয়ে দিতে রাজি হতেন ? না আমি ওঁর মাকে বলেছি আর না দিব্যা বিয়ের আগে ওঁর হবু বরকে খুলে বলেছে একথা।’

রঘুনাথ সেনগুপ্ত যেন আকাশ থেকে পড়লেন। ওঁর আদরের কন্যার শরীরে শ্বেতী হয়েছে। কি সর্বনাশের কথা। আর উনি নিজে তার কিছুই জানেন না। এরা মা মেয়ে দুজনেই সমস্ত ব্যাপারটা চেপে গেছে। অবাক হয়ে গিন্নিকে জিজ্ঞাসা করলেন,’সে কি ! কি বলছ তুমি ? আমি তো এসবের কিছুই জানি না। তা মা, তোর বরকে জানিয়ছিস, নাকি এখনো জানাস নি তোর এই রোগের কথা ?’

দিব্যা কিছু বলার আগেই নমিতা দেবী বলে উঠলেন,’জামাই জানে এবং দিব্যাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়ে ওর ট্রিটমেন্ট করাচ্ছে। ভাবতে পারো ওদের মানসিকতা কত উদার আর ছেলেটা কত ভাল ছেলে। আর ও তো দিব্যার কাছে স্বীকার করেছে যে ওর আসল রোগের কথা ও জানতো না। সুতরাং অনিকের তো কোন দোষ নেই। দোষ ওর বাবা মার। তারা সব জেনেও ছেলে ও তার শ্বশুরবাড়ির কাছে সব চেপে গেছেন। আমার মনে হয় ওরা অনিকের চিকিৎসায় নিশ্চিন্ত হয়ে এই বিয়ে দিয়েছেন। এবার তুমি বল দিব্যা অনিকের সাথে কেন ডিভোর্স নেবে ? আমি তো বলব অনিক উল্টে দিব্যার চিকিৎসা করিয়ে ওকে সুস্থ করবার চেষ্টা করছে। ও ভীষণ ভাল ছেলে।’

রঘুনাথ বাবু এবার গম্ভীর হয়ে চুপ মেরে গেলেন। দিব্যা তখনও বুঝতে পাড়ছে না বাবা কি ডিসিশন নেবেন। দেখল বাবা চিন্তান্বিত ভাবে উঠে ঘরে ছেড়ে বেড়িয়ে চলে গেলেন নিজের ঘরে। নমিতা দেবী মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,’তুই এবার শুয়ে পড় মা। এইসব ব্যাপারে একদম মন খারাপ করবি না। আমি তোর বাবাকে আবার বোঝাব সব। আর এসব কথা জামাইকে কিচ্ছু জানাবি না বলে দিলাম। আমি যাই রাত হয়েছে। তুই শুয়ে পড় মা।’  বলে ঘরের বড় আলোটা নিভিয়ে চলে গেলেন নমিতা দেবী। দিব্যাও ছাঁতের দিকে চেয়ে শুয়ে পড়ল।

মিনিট দশেক বাদেই ওর সেলে ফোন এল অনিকের। ‘কি হল, ঘুমিয়ে পড়েছ নাকি ?’

‘না গো। ঘুম আসছে না।’

‘বুঝেছি, পাশে আমি নেই তো তাই। আমারও ঘুম আসছে না। অনেকদিন পর তোমাকে ছাড়া এই রাত।’

‘দিব্যা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। আর কাঁদতে কাঁদতেই বলল,’ আমার একদম ভাল লাগছে না। কেন তুমি আমাকে ফেলে রেখে গেলে অনিক। আমি একা একা থাকতে পারব না এখানে। তুমি কালই আমাকে এসে নিয়ে যাও।’

অনিক ওপার থেকে হেসে বলল,’পাগলী মেয়ে। আমি তো তোমার বুকের মধ্যেই আছি। ভালো কথা, তুমি ওষুধ গুলি খাচ্ছ ঠিক মত নাকি বাপের বাড়ি গিয়ে সব ভুলে গেলে ?’

অনিকের কথা শুনে দিব্যা আরও জোরে কাঁদতে থাকে। অতদুরে ঐ বাড়িতে বসেও ও কি ভাবে দিব্যার রোগের কথা মনে রেখেছে ভেবে ওর বুক ফেটে কান্না উথলে উঠল। কাঁদতে কাঁদতেই বলল,’আমি সব খাচ্ছি মশাই। নিজের ওষুধ গুলি কি খাচ্ছেন আপনি ? নাকি আবার লুকিয়ে সিগারেট খাচ্ছ ? মনে রাখবে তুমি কিন্তু আমাকে মাথায় হাত দিয়ে কথা দিয়েছ সেদিন।’

অনিক ওপার থেকে বলে ওঠে,’আবার সিগারেট ? না বাবা, আর নয়। কান ধরেছি। এবার তুমি তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে এসো আমি তাতেই খুশি। আচ্ছা, এখন ঘুমিয়ে পড় সোনা। অনেক রাত হয়য়ে গেছে। গুড নাইট।’

পরদিন বাবা বাড়িতে, দাদারা অফিসে। বড়দার চার বছরের একমাত্র ছেলে পিসি বেড়াতে এসেছে বলে ওর নার্সারি স্কুলে আর যায়নি। কাকিন আর পিসির সাথে খুব খেলা ধুলা করছে। রাঁধুনি সবার জন্য লুচি তরকারি বানিয়েছে টিফিনে। ডাইনিং টেবিলে বাবার উল্টোদিকে ছোট বৌদির পাশে বসে টিফিন খেতে গিয়ে দিব্যা লক্ষ করলা বাবা সকাল থেকেই গম্ভীর হয়ে আছেন। মা কিছু জিজ্ঞাসা করলে শুধু হু হাঁ করে জবাব দিচ্ছেন। দিব্যার বুকের ভিতরে তখনও ঢিব ঢিব করছে। আবার মায়ের উপরে ওর বিশ্বাস আছে। বাবা মার কথা ফেলবেন না।

বেলা দশটা নাগাদ, টিফিন খাবার একটু বাদেই দিব্যার গা গুলিয়ে উঠল। ঠিক সময়মত দৌড়ে বাথরুমে গিয়ে ভগভগ করে বমি করে সমস্ত টিফিনের খাবার ফেলে দিল দিব্যা। ছোট বৌদি মা সবাই দৌড়ে এসে দিব্যার পিঠ চেপে চেপে ওকে সাহায্য করল ভাল করে বমি করতে। তারপর দিব্যা চোখে মুখে জল দিয়ে এসে শুয়ে পড়ল ওর বিছানায়। ওর শরীরটা তখনও গোলাচ্ছে। মিনতি দেবী ভয় পেয়ে বড় বৌমাকে তাড়াতাড়ি ওঁদের ফামিলি ডক্টর, বি টি রোডে চেম্বার, ডক্টর চ্যাটারজিকে এসে দিব্যাকে দেখে যেতে ডাকতে বলে দিলেন। রাঘুনাথ বাবু তার ঘরেই ছিলেন। দিব্যা বমি করেছে শুনে উনিও ওর ঘরে এসে দেখে ডাক্তারের জন্য বাইরের ঘরে বসে রইলেন।

ডাক্তার চ্যাটারজি অভিজ্ঞ মানুষ। দিব্যার চোখ মুখ ও নাড়ি টিপে খাটের মাথার পাশে দাঁড়ানো মিনতি দেবীকে বললেন, ‘খবর তো খুবই ভাল। আপনার মেয়ে মা হতে চলেছে। জামাইকে খবর দিন।’ দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে শুনতে পেলেন রঘুনাথ বাবু। স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে ওঁর একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল শুধু। চলে গেলেন নিজের ঘরে। আর দিব্যার বড় বৌদি দিব্যার গাল টিপে আদর করে বলল,’ওফ ,দারুণ খবর দিব্যা। কনগ্রাচুলেশন। সাবধানে থেকো এখন থেকে। তোমার বরতো শুনে লাফাবে বোধ হয়, কি তাই না মা ?’

ওর মার চোখে তখন খুশির চ্ছটা দেখতে পেল দিব্যা। লজ্জায় লাল হয়ে দুই হাতে মুখ ঢাকল আর মনে মনে অনিকের উদ্দেশ্যে বলল,’শুনছ, তুমি কিন্তু এবার বাবা হতে চলেছ।’

নমিতা দেবী খাটের এ পাশে এসে দিব্যার উপর ঝুঁকে পড়ে বললেন,’আমি ভীষণ খুশি হয়েছি রে মা। চিন্তা করিস না। আমি অনিককে ফোন করে ডেকে আনছি। আজই বিকালে তুই চলে যাস তোর বাড়িতে। আমি জানি ভগবান ঠিক একদিন তোদের দিকে মুখে তুলে চাইবেন। তোদের একটা সুস্থ সবল সন্তান হবে,দেখে নিস।’

শাশুড়ি মার মুখে ও বাবা হতে চলেছে শুনে অনিক আর এক মুহূর্ত নষ্ট করল না। বাবাকে সুখবরটা দিয়ে ফোন লাগাল মাকে। মাকেও জানাল দিব্যার মায়ের ফোনের কথা। বলে দিল ও এখনই খড়দা যাচ্ছে। বিকেলের মধ্যেই ও দিব্যাকে নিয়ে বাড়ি ফিরছে। বেলা একটা নাগাদ অনিক এসে ঢুকল দিব্যার ঘরে। আগেই দরজাটা আটকে এগিয়ে গেল ওর খাটের দিকে। দিব্যা অনিকের গলার আওয়াজ পেয়েই লজ্জায় মুখ ঘুড়িয়ে শুয়ে ছিল। অনিক খাটের পাশে বসে দিব্যার মাথায় হাত রেখে বলল,’আমি এসে গেছি সোনা। তোমাদের দুজনকে আজই বাড়ি নিয়ে যাব আমি।’ বলেই দিব্যার গালে চুমু দিয়ে ওকে পেঁচিয়ে ধরে পড়ে রইল অনিক। মনে মনে ভগবানের উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করল যাতে ওদের একটা সুন্দর ফুটফুটে মেয়ে হয়, ঠিক ওর দিব্যার মত।

এই নিউজটি শেয়ার করুন...

Website Design & Developed By MD Fahim Haque - Web Solution