নিজস্ব প্রতিবেদক : নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের ৩৯ বছরের ঐতিহ্যবাহী তাহেরপুর হাজী লাল মিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় বিদ্যালয়টির মাত্র ৩১ জন শিক্ষার্থী পাস করেছে। ৭১ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৪০ জন অকৃতকার্য হওয়ায় অভিভাবক ও স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। শিক্ষার মানের এমন অবনতির জন্য বিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, পরিচালনা পর্ষদের দুর্বলতা, শিক্ষক-সমন্বয়ের অভাব ও প্রশাসনিক তদারকির ঘাটতিকে দায়ী করছেন স্থানীয় অভিভাবকরা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠার পর দীর্ঘদিন বিদ্যালয়টি এলাকায় সুনাম ধরে রাখলেও পরবর্তী সময়ে পরিচালনা পর্ষদের নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা এবং শিক্ষকদের মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার পরিবেশ ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
অভিভাবকদের অভিযোগ, বিদ্যালয়ে নিয়মিত পাঠদান, শিক্ষকদের মধ্যে সমন্বয় এবং শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার প্রতি নজরদারি আরও জোরদার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিদ্যালয় পরিচালনায় প্রকৃত শিক্ষিত ও সচেতন অভিভাবকদের সম্পৃক্ত করার দাবি জানিয়েছেন তারা। ফলাফল বিপর্যয়ের ঘটনায় অনেকে প্রধান শিক্ষক নূরুল আহাদের দায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।
বিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের অভিযোগ, অতীতে পরিচালনা পর্ষদে শিক্ষাগত যোগ্যতাসম্পন্ন ও সক্রিয় অভিভাবকদের যথাযথ প্রতিনিধিত্ব না থাকায় প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় নানা সমস্যা তৈরি হয়। এছাড়া বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ, শিক্ষকদের মধ্যে সমন্বয় এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে অসন্তোষ রয়েছে বলে তারা দাবি করেন। তবে এসব অভিযোগের স্বতন্ত্র সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিদ্যালয়ের সাবেক এক অভিভাবক সদস্য বলেন, প্রধান শিক্ষক নূরুল আহাদ যোগদানের পর বিভিন্ন সময়ে বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম ও শিক্ষা ব্যবস্থাপনা নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। তার দাবি, শিক্ষকদের একটি অংশ নানা কারণে অনেকটা কোনঠাসা থাকায় প্রতিষ্ঠানের ভেতরের সমস্যাগুলো নিয়ে কার্যকরভাবে কথা বলতে পারেননি।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নূরুল আহাদ বলেন, “সাবেক পরিচালনা পর্ষদ যেভাবে মতামত দিয়েছে, সে অনুযায়ী আমাদের চলতে হয়েছে। শিক্ষকদের পাঠদানে আন্তরিকতার কোনো ঘাটতি ছিল না। অন্যান্য বছরের তুলনায় ২০২৬ সালের পরীক্ষার্থীরা প্রস্তুতির দিক থেকে কিছুটা দুর্বল ছিল। এ কারণে ফলাফল আশানুরূপ হয়নি। শিক্ষকদের মধ্যে কোনো সমন্বয়হীনতা আছে বলে আমি মনে করি না। ভবিষ্যতে শিক্ষার মান আরও ভালো হবে।”
সম্প্রতি অনুমোদিত বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির দায়িত্বপ্রাপ্ত সভাপতি রকিবুল হাসান বলেন, বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার শুরু থেকে প্রতিষ্ঠানটির সুনাম ছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন যথাযথ নজরদারি না থাকায় বিভিন্ন সমস্যা তৈরি হয়েছে। তার দাবি, আগের পরিচালনা পর্ষদের অধিকাংশ সদস্যের পর্যাপ্ত শিক্ষাগত যোগ্যতা ছিল না। তিনি বলেন, “আমি এখন দায়িত্ব পেয়েছি। শিক্ষার মান উন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের ভালো ফলাফলের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করব।”
সোনারগাঁ উপজেলা ভারপ্রাপ্ত মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. সাঈদুর রহমান বলেন, “তাহেরপুর হাজী লাল মিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান ও পরিবেশ সন্তোষজনক নয়। সম্প্রতি নতুন একটি পরিচালনা কমিটি অনুমোদিত হয়েছে। ভবিষ্যতে শিক্ষার মান উন্নয়ন ও ভালো ফলাফলের জন্য শিক্ষকদের কার্যক্রম তদারকি করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
অভিভাবকদের প্রত্যাশা, নতুন পরিচালনা কমিটি দায়িত্ব নেওয়ার পর বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, শিক্ষকদের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি, নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত করা এবং শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা চিহ্নিত করে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হবে। তাহলেই ঐতিহ্যবাহী এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি আবারও তার হারানো সুনাম ফিরে পাবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
স্কুলছাত্রীকে লাথি মারার ভিডিও ভাইরাল, ভুক্তভোগীকেই টিসি দিল বিদ্যালয়

নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে এক স্কুলছাত্রীকে উত্ত্যক্ত ও লাথি মারার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। বৃহস্পতিবার ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ও টিকটকে ছড়িয়ে পড়ে। এ নিয়ে এলাকায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়। এ ঘটনায় স্কুল চলাকালে বাইরে ঘোরাফেরা করায় ভুক্তভোগী ছাত্রীকেই টিসি দিয়ে বের করে দিয়েছে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
ভুক্তভোগী ছাত্রী সোনারগাঁ উপজেলার কাঁচপুরের ওমর আলী উচ্চবিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী। সে কাঁচপুর ইউনিয়নের একটি এলাকার বাসিন্দা এবং বাবা পেশায় পোশাক কারখানার শ্রমিক। অভিযুক্ত সাড়ে ১১ বছর বয়সী ছেলে কাঁচপুর রায়েরটেক এলাকার ভাড়াটে। তার বাবা পেশায় রিকশাচালক ও মা পোশাক কারখানার শ্রমিক।
সোনারগাঁ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. আনোয়ার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ভাইরাল ভিডিও তাঁদের নজরে এসেছে। তবে পরিবারের পক্ষ থেকে কেউ কোনো অভিযোগ করেনি। পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেবে।
ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, শীতলক্ষ্যা নদীর ওয়াকওয়ে দিয়ে স্কুলড্রেস পরা দুই ছাত্রী হেঁটে যাচ্ছে। এ সময় একটি ছেলে পেছন থেকে এক স্কুলছাত্রীকে লাথি মারে। মেয়েটি প্রতিবাদ করলে পেছন থেকে তাকে আবার লাথি মারা হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রায় এক মাস আগে ওই বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণি ও সপ্তম শ্রেণির দুই ছাত্রী কাঁচপুর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ের ওয়াকওয়ের পাশে হাঁটতে যায়। তখন অভিযুক্ত ছেলে পেছন থেকে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ুয়া মেয়েটিকে পরপর দুইবার লাথি মারে। ছেলেটির সঙ্গে থাকা কেউ একজন সেটি মুঠোফোনে ভিডিও করে রাখে। বৃহস্পতিবার তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ও টিকটকে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
এদিকে অভিযুক্ত ছেলেটিকে সালিসে কান ধরে ওঠবস করানোর আরেকটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে ছেলেটিকে বলতে শোনা যায়, ‘একটি মেয়েকে আমি লাথি মেরেছি, সেই ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। সে জন্য আমি মাফ চাচ্ছি। এই ভুল আমার দ্বারা আর হবে না। আমি কাঁচপুর ছেড়ে চলে যাচ্ছি।’
ভুক্তভোগী স্কুলছাত্রীর বাবা প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার মেয়েকে লাথি মারার ভিডিওটি এক মাস আগের। স্কুলের সময় বাইরে ঘোরাফেরা করায় স্কুলের স্যাররা বিচার করে আমার মেয়েকে টিসি দিয়ে বের করে দিয়েছে।’ অভিযুক্ত ছেলেটির কোনো বিচার হয়েছে কি না, জানতে চাইলে তিনি জানেন না বলে জানান। তিনি বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। কাজকর্ম করে খাই। এখন এই স্কুলে পড়াতে পারব না। মেয়েকে অন্য স্কুলে ভর্তি করতে হবে।’
জানতে চাইলে ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, স্কুল কমিটি সিদ্ধান্ত নিয়ে ওই দুই ছাত্রীকে টিসি দিয়েছে। যেহেতু ঘটনাটি স্কুলের বাইরে, তাই স্থানীয় লোকজন ছেলে ও ছাত্রীদের বিচার করেছে।














