মোগরাপাড়া চৌরাস্তার মূল সড়ক এখন ভ্যান চালকদের দখলে, বাড়ছে যানজট ও জনভোগান্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক: নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত মোগরাপাড়া চৌরাস্তা। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন, আশপাশের এলাকা এবং রাজধানী ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল এটি। প্রতিদিন কয়েক হাজার মানুষ কর্মস্থল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা-বাণিজ্য, চিকিৎসা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজে এই সড়ক ব্যবহার করেন। গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডের অংশ হিসেবে পরিচিত এই সড়কটি স্থানীয়দের কাছে ‘থানা রোড’ নামেও পরিচিত।
এ সড়ককে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে একাধিক মার্কেট, বিপণিবিতান, কাঁচাবাজার, ব্যাংক, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি অফিস। ফলে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এখানে মানুষের চলাচল থাকে অত্যন্ত ব্যস্ত। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে যানজটের সমস্যায় ভুগতে থাকা এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি এখন নতুন করে ভ্যানচালকদের দখলে চলে যাওয়ায় জনদুর্ভোগ কয়েকগুণ বেড়ে গেছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত প্রায় ১৫ থেকে ২০টি ভ্যানগাড়ি রাস্তার ওপর দাঁড় করিয়ে ফল, ডাব, নারিকেল, লেবু, আচার, খেলনা, কাঁচাবাজারসহ বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে। কোথাও কোথাও রাস্তার দুই পাশেই সারিবদ্ধভাবে ভ্যান রেখে দোকান বসানো হয়েছে। এতে চলাচলের জন্য রাস্তার কার্যকর প্রস্থ অনেকটাই কমে গেছে। ফলস্বরূপ প্রতিদিনই দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণের সুফল ম্লান
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কয়েক বছর আগেও মোগরাপাড়া চৌরাস্তার এই সড়কটি ছিল অত্যন্ত জরাজীর্ণ। খানাখন্দে ভরা ভাঙাচোরা রাস্তা দিয়ে যানবাহন চলাচল ছিল কষ্টকর। বৃষ্টি হলে সড়কে পানি জমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠত। মানুষের দীর্ঘদিনের ভোগান্তির কথা বিবেচনা করে প্রায় দুই বছর আগে সড়ক ও জনপথ বিভাগের তত্ত্বাবধানে কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে সড়কটি পুনর্নির্মাণ করা হয়।
শুধু সড়কই নয়, রাস্তার পাশে প্রায় পাঁচ ফুট প্রশস্ত একটি ড্রেনও নির্মাণ করা হয়, যাতে পথচারীরা নিরাপদে চলাচল করতে পারেন এবং বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশন হয়। নতুন সড়ক নির্মাণের পর যান চলাচল অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে আসে। এলাকাবাসীও স্বস্তি ফিরে পান।
কিন্তু সেই স্বস্তি বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। অভিযোগ উঠেছে, গত কয়েক মাস ধরে একের পর এক ভ্যানগাড়ি রাস্তার ওপর দোকান বসাতে শুরু করে। প্রথমে দুই-একটি ভ্যান থাকলেও বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ১৫ থেকে ২০টিতে দাঁড়িয়েছে। রাস্তার দুই পাশে ভ্যান দাঁড় করিয়ে ব্যবসা পরিচালনার কারণে যান চলাচলের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা থাকছে না।
সড়কেই গড়ে উঠেছে অস্থায়ী বাজার
সরেজমিনে দেখা যায়, মোগরাপাড়া চৌরাস্তা থেকে শহীদ মজনু পার্ক পর্যন্ত সড়কের বিভিন্ন স্থানে সারিবদ্ধভাবে ভ্যানগাড়ি দাঁড় করিয়ে ব্যবসা চলছে। কেউ বিক্রি করছেন আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, ডাব, নারিকেল ও লেবু। আবার কেউ বিক্রি করছেন বিভিন্ন ধরনের খেলনা, আচার, কাঁচাবাজারের পণ্য কিংবা মৌসুমি ফল।
ভ্যানগুলো এমনভাবে দাঁড় করানো হয়েছে যে, অনেক স্থানে একটি বড় যানবাহন চলাচল করলে বিপরীত দিকের যানবাহনকে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। বিশেষ করে অফিস ও স্কুল-কলেজে যাতায়াতের ব্যস্ত সময়ে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
স্থানীয়দের দাবি, ভ্যানচালকদের পাশাপাশি অনেক ক্রেতাও রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে কেনাকাটা করেন। এতে যানবাহনের গতি আরও কমে যায়। মাঝে মধ্যেই ছোটখাটো দুর্ঘটনার আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে।
পথচারীদের দুর্ভোগ
রাস্তার পাশে নির্মিত ড্রেনের ওপর দিয়ে নিরাপদে চলাচলের সুযোগ থাকলেও অনেক স্থানে ভ্যানগাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখার কারণে পথচারীদের বাধ্য হয়ে মূল সড়ক ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, শিশু, নারী ও বয়স্কদের রাস্তা পারাপারে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়তে হয়। যানজটের কারণে অ্যাম্বুলেন্স কিংবা জরুরি সেবার যানবাহনও অনেক সময় আটকে থাকে।
যানজটে অতিষ্ঠ চালকরা
সড়কে চলাচলকারী বিভিন্ন যানবাহনের চালকরাও এই পরিস্থিতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
একজন ট্রাকচালক জানান, “মোগরাপাড়া চৌরাস্তা থেকে বের হতে অনেক সময় আধাঘণ্টারও বেশি সময় লেগে যায়। রাস্তার দুই পাশে ভ্যান দাঁড়িয়ে থাকার কারণে বড় গাড়ি ঘোরানো খুবই কঠিন হয়ে পড়ে। কাউকে কিছু বলতে গেলেই উল্টো তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়। অনেক সময় মারমুখী আচরণও করে।”
অটোরিকশা চালকরাও জানান, কয়েক মিনিটের পথ অতিক্রম করতে অনেক সময় ২০ থেকে ৩০ মিনিট লেগে যায়। এতে যাত্রীদের সঙ্গে প্রায়ই ভাড়া নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হয়।
ভ্যানচালকদের বক্তব্য
ভ্যানচালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের অনেকেই জীবিকার তাগিদে এখানে ব্যবসা করছেন।
তাদের দাবি, মহাসড়কের পাশে নির্ধারিত স্থানে বসতে হলে প্রতিদিন ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা দিতে হয়। কিন্তু এই সড়কে বসলে কোনো ধরনের চাঁদা দিতে হয় না। তাই একে একে অনেকেই এখানে এসে ব্যবসা শুরু করেছেন।
একজন ভ্যানচালক বলেন, “আমরা গরিব মানুষ। যেখানে চাঁদা দিতে হয় না, সেখানেই বসে ব্যবসা করি। যদি প্রশাসন আমাদের জন্য নির্দিষ্ট জায়গার ব্যবস্থা করে দেয়, তাহলে আমরা সেখানে চলে যাব।”
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ক্ষোভ
চৌরাস্তার ব্যবসায়ীরা বলছেন, রাস্তার ওপর দোকান বসানোর কারণে শুধু যানজটই নয়, স্থায়ী দোকানগুলোর ব্যবসাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
একাধিক দোকান মালিক জানান, অনেক ক্রেতা যানজটের কারণে বাজারে আসতে চান না। আবার রাস্তার ওপর অবৈধভাবে দোকান বসানোর ফলে বাজারের শৃঙ্খলাও নষ্ট হচ্ছে।
সমাজসেবক মনির হোসেনের বক্তব্য
চৌরাস্তার ব্যবসায়ী ও সমাজসেবক মনির হোসেন বলেন, “আমি নিজের অর্থায়নে কয়েক দিন পরপর ড্রেনের মুখে জমে থাকা ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করি। কিন্তু বর্তমানে মোগরাপাড়া থেকে শহীদ মজনু পার্ক পর্যন্ত প্রায় ২০ থেকে ৩০টি ভ্যানগাড়ি রাস্তার ওপর বসে বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করছে। এতে পুরো সড়কটাই যেন অস্থায়ী বাজারে পরিণত হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এখানে যানজট লেগেই থাকে। প্রশাসনের প্রতি আমার অনুরোধ, দ্রুত এসব ভ্যানগাড়ি রাস্তা থেকে সরিয়ে দেওয়া হোক। অন্যথায় ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠবে।”
জনদুর্ভোগ বাড়ছে
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সড়কটির উদ্দেশ্য ছিল মানুষের চলাচল সহজ করা। কিন্তু রাস্তার ওপর অবৈধভাবে দোকান বসানোর কারণে সেই উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে।
বিশেষ করে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্স এবং পণ্যবাহী ট্রাকগুলো সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। অনেক সময় জরুরি প্রয়োজনে বের হয়েও যানজটে আটকে থাকতে হচ্ছে।
প্রশাসনের নজরদারির দাবি
এলাকাবাসীর অভিযোগ, মাঝে মধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালত বা প্রশাসনের অভিযান পরিচালিত হলেও কিছুদিন পর আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসে। নিয়মিত নজরদারি না থাকায় অবৈধ দখলদাররা পুনরায় রাস্তার ওপর ব্যবসা শুরু করেন।
তাদের দাবি, শুধু উচ্ছেদ অভিযান চালালেই হবে না, নিয়মিত মনিটরিংয়ের পাশাপাশি ভ্যানচালকদের জন্য বিকল্প নির্ধারিত স্থান নিশ্চিত করতে হবে। এতে একদিকে যেমন যানজট কমবে, অন্যদিকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও জীবিকা নির্বাহের সুযোগ পাবেন।
সচেতন মহলের মতামত
সচেতন নাগরিকরা বলছেন, সড়ক জনসাধারণের চলাচলের জন্য। সেখানে কোনোভাবেই স্থায়ী বা অস্থায়ীভাবে দোকান বসানোর সুযোগ থাকা উচিত নয়। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জীবিকার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তাদের মতে, প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী ও ভ্যানচালকদের সমন্বয়ে একটি কার্যকর সমাধান বের করা সম্ভব। নির্দিষ্ট স্থানে হকার জোন বা ভ্যান ব্যবসার স্থান নির্ধারণ করা হলে রাস্তা দখলের প্রবণতা কমবে এবং যানজটও অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আসবে।
দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান
মোগরাপাড়া চৌরাস্তা সোনারগাঁ উপজেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার। এই সড়কে প্রতিদিন হাজারো মানুষের যাতায়াত। অথচ অবৈধভাবে ভ্যানগাড়ি বসিয়ে ব্যবসা পরিচালনার কারণে সাধারণ মানুষকে প্রতিনিয়ত দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
এলাকাবাসীর দাবি, কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই সড়ককে দখলমুক্ত রাখতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা, অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং বিকল্প স্থানে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে যানজট নিরসনে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা জোরদার করা এবং সড়ক দখলকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণেরও দাবি জানিয়েছেন তারা।

প্রশাসনের বক্তব্য
সোনারগাঁ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসিফ আল জিনাত বলেন, “সড়ক দখলমুক্ত রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হবে। তারা নিয়মিত নজরদারির মাধ্যমে সড়ক থেকে অবৈধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা ভ্যানগাড়ি অপসারণে কাজ করবেন।”

স্থানীয়দের আশা, সংশ্লিষ্ট প্রশাসন দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করলে মোগরাপাড়া চৌরাস্তার দীর্ঘদিনের যানজট ও জনভোগান্তির অবসান ঘটবে এবং সাধারণ মানুষ নির্বিঘ্নে এই গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ব্যবহার করতে পারবেন।

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *