ভাষা আন্দোলনের অগ্রসেনানী সোনারগাঁয়ের ড. নূরুল হক ভূঁইয়া

নিউজ সোনারগাঁ : বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার ইতিহাসে কিছু নাম ধ্রুবতারার মতো উজ্জ্বল হলেও প্রচারের আলো থেকে তাঁরা অনেকটা অন্তরালেই রয়ে গেছেন। তেমনই এক ক্ষণজন্মা পুরুষ ভাষা আন্দোলনের প্রথম সারির সংগঠক এবং প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ড. এ এস এম নূরুল হক ভূঁইয়া। জাতির ক্রান্তিলগ্নে তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্ব এবং বিজ্ঞানের নিভৃত সাধনায় তাঁর অনবদ্য অবদান আজ আমাদের গর্বের সম্পদ।

জন্ম ও শৈশব: ড. নুরুল হক ভূইয়া ১৯২৩ সালের ১ মে,  ঐতিহাসিক সোনারগাঁয়ের নোয়াগাঁও ইউনিয়নের  গোবিন্দপুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে  জন্ম গ্রহণ করেন।ড. নূরুল হক ভূইয়ার পুরো নাম আবু সাইদ মোহাম্মদ নুরুল হক ভূইয়া। পিতা মৌলভী সাহাবদ্দীন ভূঁইয়ার আদর্শে বড় হওয়া নূরুল হকের শৈশব নাম ছিল মনির হোসেন। ছয় ভাই ও এক বোনের সংসারে মেধার দীপ্তিতে শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন অনন্য।

শিক্ষাজীবন: মেধার অসামান্য স্বাক্ষর

বড় ভাই রমিজদ্দীন ভূঁইয়ার হাত ধরে বিদ্যাপীঠে যাত্রা শুরু। প্রাথমিক স্তরেই তাঁর নাম পরিবর্তিত হয়ে ‘নূরুল হক ভূঁইয়া’ স্থায়ী হয়। ১৯৩৯ সালে মহজমপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ডিস্টিংশনসহ প্রথম বিভাগে প্রবেশিকা (এন্ট্রান্স) পাস করার পর তিনি উচ্চশিক্ষার পথে ধাবিত হন। ১৯৪৪ সালে বিএসসি (অনার্স) এবং ১৯৪৫ সালে অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে এমএসসি সম্পন্ন করেন। পরবর্তীকালে ১৯৭৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘স্টাডিজ অন মেটাল সালফাইড’ বিষয়ের ওপর গবেষণার স্বীকৃতিস্বরূপ পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।

কর্মজীবন ও শেকড়ের টান:

১৯৪৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে শুরু হয় তাঁর দীর্ঘ ৩৭ বছরের গৌরবময় শিক্ষকতা জীবন। ১৯৮৪ সালে বিভাগীয় চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি অবসর নেন। তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের স্যার এফ  রহমান হলের প্রথম প্রভোস্ট। ড. নুরুল হক ভূইয়ার দেশপ্রেম ছিল প্রশ্নাতীত। ১৯৪৮ সালে কমনওয়েলথ বৃত্তি এবং ১৯৬০ সালে পাকিস্তান এটমিক এনার্জি কমিশনের ফেলোশিপ লাভের সুযোগ এলেও বিদেশের হাতছানি তাঁকে টলাতে পারেনি; মাতৃভূমির সেবা করতেই তিনি দেশে থেকে যাওয়াকে শ্রেষ্ঠ মনে করেছিলেন।

ভাষা আন্দোলনে অবিস্মরণীয় ভূমিকা:

ড. নূরুল হক ভূঁইয়া ছিলেন ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলনের অন্যতম নেপথ্য কারিগর। রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও সাংস্কৃতিক চেতনায় ঋদ্ধ এই মানুষটি ১৯৪৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর অধ্যাপক আবুল কাসেমের সাথে মিলে প্রতিষ্ঠা করেন ঐতিহাসিক ‘তমুদ্দুন মজলিস’। তিনি ছিলেন এর প্রতিষ্ঠাতা সাংস্কৃতিক সম্পাদক।

ভাষা আন্দোলনের সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুত করতে ১৯৪৭ সালের ১ অক্টোবর গঠিত প্রথম ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’-এর প্রথম আহ্বায়কের গুরুদায়িত্ব অর্পিত হয় তাঁর কাঁধেই। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অব্যবহিত পরেই তাঁর বড় ভাই রমিজ উদ্দিন ভূইয়ার তৎকালীন আবাসস্থল ‘লিলি কটেজ’-এ অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক বৈঠকে তিনি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে সোচ্চার হন, যা পরবর্তীকালে গণআন্দোলনের রূপ নেয়।

বিজ্ঞানী ও লেখক হিসেবে অবদান:

বিজ্ঞান সাধনায় তিনি ছিলেন এক বিরল প্রতিভা। পাটের অগ্নিরোধক মিশ্রণ এবং পাটখড়ি থেকে জাইলোজ উৎপাদনের পদ্ধতি আবিষ্কার করে তিনি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এছাড়া বর্জ্য জিপসাম থেকে সার উৎপাদনের তাঁর আবিষ্কৃত পদ্ধতি শিল্পক্ষেত্রে বৈপ্লবিক ভূমিকা রাখে। মাতৃভাষায় বিজ্ঞান চর্চাকে জনপ্রিয় করতে তিনি শিক্ষার্থীদের জন্য রচনা করেন অনন্য পাঠ্যবই ‘শিল্প রসায়ন ও রসায়ন প্রযুক্তি’।

প্রচারবিমুখ ও প্রচারবিলাসহীন এই মহান মনীষী ১৯৯৮ সালে মৃত্যুর বরণ করার পূর্ব পর্যন্ত সময়ে নিরবে  নিভৃতে বাংলাদেশের সেবা করে গেছেন। আজ আমরা যে স্বাধীন ভূখণ্ড ও মাতৃভাষার মর্যাদা নিয়ে বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে আছি, তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনে ড. নূরুল হক ভূঁইয়ার ত্যাগ ও অবদান ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। গুণী এই মানুষের জীবন ও কর্ম নতুন প্রজন্মের কাছে এক অনন্ত অনুপ্রেরণার উৎস।

মাহফুজুল ইসলাম হায়দার
সহযোগী অধ্যাপক, ইতিহাস,
সোনারগাঁও সরকারি কলেজ।

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *