নিজস্ব প্রতিবেদক : লিবিয়ায় বাংলাদেশি প্রবাসী শ্রমিককে অস্ত্রের মুখে অপহরণ করে আটকে রেখে নির্যাতনের ভিডিও পরিবারের কাছে পাঠিয়ে মুক্তিপণ আদায়কারী চক্রের দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) নারায়ণগঞ্জ জেলা। গ্রেপ্তার দুজনের মধ্যে এক নারী আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে জানিয়েছে পিবিআই।
গ্রেপ্তাররা হলেন মামলার এজাহারভুক্ত ১ নম্বর আসামি উত্তম সরকার ওরফে সুমন (৪৪) এবং ৭ নম্বর আসামি মর্জিনা বেগম (৩৯)। বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) পিবিআই নারায়ণগঞ্জ জেলা এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানায়।
পিবিআই জানায়, নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার বিজয়নগর গ্রামের প্রবাসী ইদ্রিস আলী (৫৪) দীর্ঘদিন ধরে লিবিয়ায় বসবাস করে আসছিলেন। গত ১৭ মার্চ ২০২৫ স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টার দিকে লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলির আনজারা এলাকায় বাসার সামনে তিনটি গাড়িতে করে কয়েকজন ব্যক্তি অস্ত্রসহ এসে তাকে ঘিরে ফেলে। পরে অস্ত্রের মুখে ভয় দেখিয়ে তাকে অপহরণ করে গাড়িতে তুলে চোখ বেঁধে ফেলে।
অপহরণকারীরা ইদ্রিস আলীর পাসপোর্ট, মোবাইল ফোন, টাকা ও অন্যান্য কাগজপত্র নিয়ে নেয়। প্রায় দুই থেকে তিন ঘণ্টা গাড়ি চালানোর পর অজ্ঞাত একটি ভবনের কক্ষে নিয়ে তাকে আটকে রাখা হয়।
দুই দিন পর তাকে অন্য একটি কক্ষে নিয়ে মারধর করা হয়। সেই নির্যাতনের ভিডিও মোবাইল অ্যাপ ইমোর মাধ্যমে ইদ্রিস আলীর স্ত্রী ফাতেমা বেগমের কাছে পাঠিয়ে স্বামীকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। এরপর অপহরণকারীরা মুক্তিপণ হিসেবে ২০ লাখ টাকা দাবি করে।
স্বামীর জীবন বাঁচাতে ইদ্রিস আলীর স্ত্রী আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধারদেনা করে গত বছরের ১৯ মার্চ শিপন মিয়ার নামে একটি ইসলামী ব্যাংক হিসাবে ২০ লাখ টাকা পাঠান। টাকা পাওয়ার পর কিছুদিন নির্যাতন বন্ধ থাকলেও পরে আবারও মারধর শুরু করে চক্রটি। একপর্যায়ে আরও ৩০ লাখ টাকা দাবি করা হয়।
পিবিআইয়ের তথ্যমতে, নির্যাতনের একপর্যায়ে লোহার রড দিয়ে মারধর করায় ইদ্রিস আলীর ডান পা ভেঙে যায় এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে জখম হয়। তাকে দিনে মাত্র একটি রুটি ও এক বোতল পানি দেওয়া হতো বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরবর্তীতে ইদ্রিস আলীর স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব ও বিকাশের মাধ্যমে আরও টাকা পাঠান। সব মিলিয়ে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৫০ লাখ ৫০ হাজার টাকা পাঠানো হয় বলে পিবিআই জানিয়েছে।
প্রায় এক মাস ১৪ দিন আটকে রাখার পর গত বছরের ৮ এপ্রিল ইদ্রিস আলীকে চোখ বেঁধে গাড়িতে তুলে ত্রিপোলির মদিনা এলাকায় রাস্তার পাশে ফেলে রেখে যায় অপহরণকারীরা। পরে লিবিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তায় গত বছরের ২২ জুলাই তিনি দেশে ফেরেন।
এ ঘটনায় ইদ্রিস আলী বাদী হয়ে সোনারগাঁ থানায় মামলা করেন। মামলাটি পিবিআইয়ের তফসিলভুক্ত হওয়ায় গত ১৬ সেপ্টেম্বর পিবিআই নারায়ণগঞ্জ জেলা তদন্তের দায়িত্ব নেয়।
পিবিআই জানায়, তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানার সাইনবোর্ড এলাকা থেকে উত্তম সরকার ওরফে সুমন এবং মর্জিনা বেগমকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাদের আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করা হলে আদালত তিন দিনের পুলিশ রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে চক্রটি লিবিয়ার রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে বাংলাদেশি প্রবাসী শ্রমিকদের টার্গেট করে অস্ত্রের মুখে অপহরণ, শারীরিক নির্যাতন এবং পরিবারের কাছে নির্যাতনের ভিডিও পাঠিয়ে ব্যাংক ও বিকাশের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায় করত বলে তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পিবিআই।
বুধবার তিন দিনের রিমান্ড শেষে দুই আসামিকে আদালতে পাঠানো হয়। এ সময় মর্জিনা বেগম আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
পিবিআই আরও জানিয়েছে, এই সংঘবদ্ধ চক্রের অন্য সদস্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং মামলার তদন্ত কার্যক্রম চলমান।



