ইসলামের ইতিহাস ও নবী মহুাম্মদ (সা.) এর জীবনী/ অধ্যয়ন করলে দেখা যায়, পরামর্শ গ্রহণ এবং পরামর্শ প্রদানের গুরুত্ব কতটা ছিল। আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেন “এবং যারা নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করে কাজ করে ” সূরা আল-শুরা (৪২:৩৮)
এই আয়াতে আল্লাহ বলেন, মুমিনেরা তাদের কাজকর্ম নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করে ঠিক করে নেয়। অর্থাৎ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে শুরা বা পরামর্শের গুরুত্ব অনেক বেশি ।
নবীজির জীবনে পরামর্শ কেবলমাত্র একটি সামাজিক রীতি নীতি ছিলনা, বরং তা ছিল সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। পরামর্শের মাধ্যমে নবীজি র নেতৃত্ব ও মিশনের উন্নয়ন ঘটে এবং ইসলামের সুসংহত ভিত্তি গড়ে ওঠে । নবীজি সাহবী (রাঃ) গনকে নিয়ে ও পরামর্শ করতেন। সাহাবী (রাঃ)’গন বলতে বাধ্য হতেন যে , হুযুর (সাঃ) এর মতো এতো মাশোয়ারা বা পরামর্শ করতে আর কাউকে দেখিনি ।
প্রথমত, নবীজির জীবনে পরামর্শের গুরুত্বের মলূ কারণ ছিল সম্মিলিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জন। নবী (সা.) সর্বদাই আল্লাহর নির্দেশনা অনসুরণ করলেও, বিভিন্ন সমস্যার সমাধানের জন্য সাহাবাদের মতামত গ্রহণ করতেন। এটি ছিল এক ধরনের দলগত চিন্তা-ভাবনা, যা ভুলের সম্ভাবনা কমায় এবং সঠিক পথ অনসুরণের সহায়ক হয়। উদাহরণস্বরূপ, খলিফা হিজরত মদিনায় মহান যুদ্ধে যখন দুশ্চিন্তায় পড়েন, তখন সাহাবাদের পরামর্শ গ্রহণ করে কৌশল নির্ধারণ করতেন। এতে তার নেতৃত্ব শক্তিশালী ও কার্যকর হয়।
দ্বিতীয়ত, নবীজির জীবনে পরামর্শ ছিল সততা ও বিনিময়ের মাধ্যম। পরামর্শদাতারা তার সাথে খোলামেলা আলোচনা করতেন এবং নবী (সা.) তাদের মতামত শ্রবণ করতেন। এতে একটি বিশ্বাসের পরিবেশ তৈরি হতো যা সামগ্রিক সামাজি ক ঐক্যের জন্ম দেয়। এমনকি কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়ও নবী সাহাবাদের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে সিদ্ধান্ত নিতেন, যা দলের সকল সদস্যকে সম্মানিত ও সুরক্ষিত বোধ করতো। এটি পরামর্শের মাধ্যমে নেতৃত্বের গণতন্ত্রও সহযোগিতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে ।
তৃতীয়ত, পরামর্শ নবীজির জীবনে সমস্যা সমাধানে র একটি কার্যকর উপায় ছি ল। নবী (সা.) যেখানেই সমস্যার সম্মুখীন হতেন, যেমন কুরাইশদের বিরোধ, মদিনার অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বা যুদ্ধকালীন সংকট, তিনি সব সময় সাহাবাদের সাথে আলোচনা করতেন। এক্ষেত্রে পরামর্শ ছিল সমস্যা বিশ্লেষণ ও সমাধানের পথ উদঘাটনের অন্যতম মাধ্যম। এতে শুধুমাত্র মহুাম্মদ (সা.)র ব্যক্তিগত জ্ঞানেই সীমাবদ্ধ না থেকে সম্পুর্ণ সমাজের বদ্ধিুদ্ধিমত্তা কাজে লাগানো সহজ হতো।
চতুর্থত, পরামর্শ নবীজির জীবনে নেতৃত্ব বিকাশের অন্যতম হাতিয়ার ছিল। নবী (সা.) নিজে একজন প্রাজ্ঞ ও দরূদর্শী নেতা হলেও, তিনি বঝুতে পারতেন একা নেতৃত্ব দেয়া যথেষ্ট নয়।
বিভিন্ন সময় সাহাবাদের পরামর্শ গ্রহণ করে তিনি আরও উন্নত ও ফলপ্রসূনীতি গ্রহণ করতে ন।
এটি নবীজির নেতৃত্বকে সময়োপযোগী, কার্যকর এবং মানবিক করে তুলত। অবশেষে, নবীজির জীবনে পরামর্শের মাধ্যমে ইসলামের সুশাসন ও সমাজ ব্যবস্থার ভিত্তি মজবতু হয়। পরামর্শ গ্রহণের মাধ্যমে নবীজির নেতৃত্বে দলগত ঐক্য সৃষ্টি হয়েছিল এবং কঠিন সময়ে সাহাবারা একযোগে কাজ করতে পারত। এভাবেই নবীজির পরামর্শ গ্রহণের সংস্কৃতি ইসলামের ইতিহাসে এক মহৎ দৃষ্টান্ত হয়ে আছে ।
সংক্ষেপে বলা যায়, নবীজির জীবনে পরামর্শ ছিল সফল নেতৃত্ব, সম্মিলিত বদ্ধিুদ্ধিমত্তা, সমস্যার সমাধান এবং সমাজের ঐক্য রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। তিনি দেখিয়েছেন যে নেতৃত্ব মানেই একক সিদ্ধান্ত নয়, বরং পরামর্শ গ্রহণের মাধ্যমে সর্বোত্তম সিদ্ধান্ত গ্রহণের নাম। তাই বর্তমান যুগে ও আমরা নবীজির পরামর্শ গ্রহণের ঐতিহ্য থেকে শিক্ষা নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে দলগত চিন্তাভাবনা ও মতবিনিময়কে গুরুত্ব দেয়া উচিত। এতে ব্যক্তি গত এবং সামাজিক জীবনে উন্নতি এবং শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব।
লেখক পরিচিতি :-
মোঃ মহসীন কবীর,
সহকারী ম্যানেজার (অবঃ), সাধারণ বীমা কর্পোরেশনের (সাবীক), অর্থ মন্ত্রণালয়াধীন, ঢাকা।



